ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
তিনি বলেন, “গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়েছে। এর মধ্যে ইভিএম-সংক্রান্ত বিধান বাতিল করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আদালত কর্তৃক ঘোষিত পলাতক আসামিরা এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।”
ড. আসিফ নজরুল জানান, প্রার্থীর দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে আয়, সম্পদ ও সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ দিতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন, এই তথ্য নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে, যাতে নাগরিকরা সহজেই তা জানতে পারেন।
তিনি বলেন, “প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘না’ ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কোনো আসনে একজন প্রার্থী থাকলে ভোটাররা চাইলে ‘না’ ভোট দিতে পারবেন। যদি ‘না’ ভোট প্রাধান্য পায়, তবে সে আসনে পুনঃভোট হবে। এতে ২০১৪ সালের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা আর ঘটবে না।”
আরপিও সংশোধনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনে রাজনৈতিক জোট হিসেবে অংশ নিলে প্রার্থীরা নিজেদের দলের প্রতীকে ভোট করবেন। এতে ভোটাররা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন প্রার্থী কোন দলের প্রতিনিধি।
নতুন বিধানে পোস্টাল ব্যালট ভোট চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশি, নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং কারা হেফাজতে থাকা ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ভোট গণনার সময় সাংবাদিকদের উপস্থিতি রাখার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। আইন উপদেষ্টা বলেন, “মিডিয়া কর্মীরা যেন ভোট গণনার স্থানে উপস্থিত থেকে প্রতিবেদন করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে।”
রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে নতুন বিধানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি কোনো দলকে ৫০ হাজার টাকার বেশি অনুদান দিতে চান, তবে তা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দিতে হবে। অনুদানদাতাকে ট্যাক্স রিটার্ন দাখিলের প্রমাণও দিতে হবে।
আইন উপদেষ্টা জানান, “আগের আইনে বিধান ছিল—কোনো ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম হলে কেবল ওই কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করা যেত। এখন নির্বাচন কমিশন চাইলে পুরো নির্বাচনী এলাকার ভোটও বাতিল করতে পারবে, যদি মনে করে সেখানে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। সেই ক্ষমতা ইসিকে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “জেলা নির্বাচন অফিসের দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তাঁরা নির্বাচনী প্রস্তুতি ও তদারকিতে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।”
সংশোধিত আরপিওতে ইভিএম বাতিল, ‘না’ ভোটের পুনঃপ্রবর্তন, জামানত বৃদ্ধি, প্রার্থীর সম্পদ প্রকাশ, পোস্টাল ভোট এবং অনুদানের স্বচ্ছতা—এই বিধানগুলোকে নির্বাচনকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
এলিস/এসএন