আট মাসে ৭২টির বেশি বৈঠকে দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক ও উত্তেজনা জনগণের নজর কেড়েছে। অনেক জল্পনা-কল্পনা আর টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে এভাবেই ৪৮ দফা সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। আলোচিত এই সংস্কার প্রস্তাবের নাম ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। এই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ গতকাল মঙ্গলবার সরকারের কাছে জমা দিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
কমিশনের ৪৮ দফা সুপারিশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আগের নিয়ম বা বিধিবিধানের পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলোর প্রতি জনগণের সম্মতি আদায়ে গণভোট, সংবিধান সংশোধন, নির্বাচন কমিশন সংস্কার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও একাধিক পদে থাকার বিধান, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসনসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগে সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো সবই রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামোর সংস্কার বা পরিবর্তন বলে মনে করা হচ্ছে; যেগুলো বাস্তবায়ন হলে সর্বস্তরে ক্ষমতার মধ্যে একধরনের ভারসাম্য তৈরি হবে।
সুপারিশগুলোর মধ্যে অন্যতম বিষয় হলো গণভোট। এই ৪৮ দফা বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সম্মতি দিলে তা সংবিধানের অংশ হবে।
স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে এবারই এত বড় গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বা সুপারিশ প্রণয়ন করা হলো। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই সংস্কার প্রস্তাব গত আট মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে তৈরি করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। যদিও সব ইস্যুতে এখনো দলগুলো একমত হতে পারেনি। এসব প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেস্টা পরিষদে অনুমোদনের পর এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি এবং পরে গণভোটের মাধ্যমে গৃহীত হওয়ার কথা রয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায়-সম্পর্কিত সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি। অনুষ্ঠানে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ইফতেখারুজ্জামান, বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, মো. আইয়ুব মিয়া ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রস্তাবিত কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য দুটি বিকল্প পথনির্দেশ দিয়েছে, যার মাধ্যমে জুলাই সনদের মূল চেতনা বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারকে তিন ধাপে জুলাই সনদ কার্যকর করতে হবে এবং জাতীয় নির্বাচনের দিন বা তার আগে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের ইস্যুগুলো থাকবে না। কমিশন ৪৮টি বিষয়ে আদেশ জারি করার সুপারিশ করেছে এবং জানিয়েছে, আগামী সংসদকে সংবিধান সংস্কারের কাজ ৯ মাসের (২৭০ দিন) মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। তবে সংসদ এটি করতে অসমর্থ হলে প্রস্তাবিত বিষয়গুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করা এখন অপরিহার্য এবং এই প্রক্রিয়াই জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে এ বিষয়ে রাজনৈতিক ঐক্য অত্যন্ত জরুরি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
গণভোটের বিষয়
‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত তফসিল-১-এর সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলোর প্রতি জনগণের সম্মতি আদায়ের জন্য একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
গণভোটের প্রশ্ন
গণভোটে জনগণকে জিজ্ঞাসা করা হবে, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ইহার তফসিল-১-এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ হস্তান্তর অনুষ্ঠান শেষে দুপুর সোয়া ২টার দিকে ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। এ সময় তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই ‘গণভোট’ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত গণভোট হতে পারে। তবে এ নিয়ে দিনক্ষণ বেঁধে দেওয়ার পক্ষে নয় কমিশন। এ বিষয়ে তফসিল ঘোষণা করতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করবে সরকার। সনদের কিছু বিষয় অফিস আদেশের মাধ্যমেও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো গণভোটে উল্লেখ থাকবে না।
জুলাই সনদ অনুযায়ীই সংবিধান সংস্কার পরিষদকে সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে চাইলেও আগামী জাতীয় সংসদ তাদের ইচ্ছেমতো সংবিধানে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন, সংযোজন, বিয়োজন করতে পারবে না বলে জানান ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, সংবিধানসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে বাস্তবায়নের জন্য ৪৮টি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এখানে একসঙ্গে ৪৮টি বিষয়ের বাস্তবায়নেই গণভোট আয়োজন করা হবে। প্রস্তাব দুটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে সরকার জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলো কার্যকর করার জন্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করবে। আদেশ এবং এর তফসিলে উল্লিখিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলো গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। আদেশ জারির পর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। যেখানে একটি প্রস্তাবে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত হওয়ার পাশাপাশি একই সঙ্গে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে।
এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সংস্কার-সম্পর্কিত বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া বিল গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। পরিষদ ২৭০ দিনের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং সংস্কার কার্যক্রম শেষ হলে পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদকে একধরনের গাঠনিক ক্ষমতা দেওয়া হবে। তারা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজন করতে পারবে। এই সংসদ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করবে। এগুলো বিল আকারে জনগণের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। অন্য প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গণভোটে অনুমোদন পাওয়া সংবিধান সংস্কার বিল পরিষদের সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হবে এবং পরিষদ ৯ মাসের (২৭০ দিন) মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।
আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের উপায় হিসেবে সরকারকে তিনটি ভাগে সুপারিশ করেছে ঐকমত্য কমিশন। তিনি বলেন, যেসব বিষয় সংবিধানসংশ্লিষ্ট নয়, তা সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারে এবং সুপারিশের অনেক বিষয় আছে, যা অফিসের আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশনের কোনো মতভিন্নতাও নেই। তাই এ দুটি বিষয় অধ্যাদেশ এবং অফিস আদেশের মাধ্যমে অবিলম্বে বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করেছে কমিশন। কোন বিষয়গুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে এবং কোন বিষয়গুলো অফিস আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে তা সুনির্দিষ্ট করে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গতকালই সব রাজনৈতিক দলকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার এই সুপারিশমালা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এদিকে জুলাই জাতীয় সনদে এনসিপি এবং সিপিবির নেতৃত্বাধীন ৬টি বাম রাজনৈতিক দল এখনো স্বাক্ষর করেনি। এমন পরিস্থিতিতে সনদের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয় কি না জানতে চাইলে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। আশা করি, বাকি ৩ দিনের মধ্যে তারা সনদে সই করবে।’