তিলে তিলে সাজানো সংসার, ঘরময় নানা আসবাব, দরকারি কাগজ- সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শ্রমে-ঘামে জমানো টাকাকড়িও আগুনে পুড়েছে। স্বপ্ন পুড়ে ছাই হওয়া অসহায় শ্রমিকরা জানে না, কোথায় গেলে মিলবে মাথা গোঁজার ঠাঁই।
গতকাল মঙ্গলবার মাগরিবের আজানের পর আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়তে থাকে বনানীর কড়াইল বস্তি। বস্তির বউ বাজারের কুমিল্লাপট্টি, বরিশালপট্টি, ক ব্লক, বড় নৌকাঘাট এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
বুধবার (২৬ নভেম্বর) ভোরে কড়াইল বস্তিতে গিয়ে কথা হয় হতভাগ্য বস্তিবাসীদের সঙ্গে। যাদের ঘর পুড়ে গেছে। তারা টিন, জানালা খুলে ভাঙারি দোকানে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পুরনো টিন প্রতি কেজি ৫০-৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও দুর্যোগের সুযোগে সে টিনের দাম ২০ টাকায় নামিয়ে এনেছেন দোকানি। এ নিয়ে ভাঙারি দোকানে তর্কাতর্কি একপর্যায়ে হাতাহাতিতে গড়ায়।
যাদের ঘরের কিছু আসবাবপত্র রক্ষা পেয়েছে, সেগুলো সরিয়ে নিতে প্রতিবেশীরা হাত লাগিয়েছেন। কোঁদাল, বেলচা, শাবল যে যা কিছু পেয়েছেন, নিয়ে এসেছেন। ছাইয়ের স্তুপ সরিয়ে দ্রুত ঘর মেরামত করতে হবে। তাদের লক্ষ্য, সপ্তাহখানেকের মধ্যে আগুনের জঞ্জাল সরিয়ে কড়াইল বস্তিতে প্রাণ ফেরানো।
কড়াইল বস্তিবাসীর জন্য অগ্নিকাণ্ড নতুন ঘটনা নয়। প্রতি বছর ছোট বড় আগুনে তাদের স্বপ্ন পুড়ে। তাই সবার মুখে কথা একটাই - ‘আগুন লইয়াই আমরা থাকি। আগুন কী নতুন ঘটনা? প্রত্যেকবার আগুন লাগে আর আমাগো সব পুুইড়া যায়। আমরা পোড়া কপাইল্যা।’
কড়াইলের বড় নৌকাঘাট পাড়ে বসে কাঁদছিল চার বছরের সালমান ও তার দুই বছর বয়সী বোন হামিদা। আগুনে তাদের ঘর পুড়ে গেছে। মা-বাবা দুজনেই সেই ছাই ঘেটে পুড়া আসবাবপত্র বের করতে ব্যস্ত ছিলেন।
তাদের খালু আবদুল মমিন তাদের নিয়ে বসেছিলেন খেয়াঘাটে। মমিন বলেন, আমাদের পরিবারের ১৪ জন সদস্য। সবাই কড়াইলে থাকি। আগুনে সবার ঘর পুড়েছে। বাচ্চাদের খাবার বের করতে পারিনি। এখন ওদের খাবার জোগাড় করতে এক ভাইকে পাঠিয়েছি৷ ওরা ক্ষুধায় কাঁদছে।
আবদুল মমিন বলেন, নিজেরা খোলা আকাশের নিচে বসে থাকছি তাতে সমস্যা না। কিন্তু এই রোদ, ধুলা আর গরম থেকে শিশুদের দূরে নিয়ে যেতে হবে। কোথায় যাব, সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।
ক ব্লকে পোড়া ঘর থেকে তৈজসপত্র খুঁজছিলেন ষাটোর্ধ্ব কুলসুম বেগম। তবে ঘরের কোনো জিনিসই অক্ষত ছিল না। টাকা, দরকারি নথি সব পুড়েছে। আগুন লাগার পরে কেবল তিন বছর বয়সী নাতনিকে নিয়ে বের হতে পেরেছিলেন তিনি।
কথায় কথায় তিনি বলেন, ‘গত ১২ বছর আগে আমি কড়াইলে জায়গা কিনি এই ক ব্লকেই। এক প্রান্তে ছয়টি অন্য প্রান্তে ৮টি রুম আমার ছেলে আলী হোসেন ভাড়া দিসিল। কোনো ঘরের ভাড়াটিয়া তাদের আসবাবপত্র, পরনের কাপড় বাঁচাতে পারেন নাই। শুধু জান নিয়ে দৌঁড়াইসে। আমিও কিছু বাঁচাইতে পারলাম না। আমার তো সব শেষ।’
রিকশাচাল শাওন স্ত্রী মুন্নী ও তিন বছর বয়সী মেয়ে সাবিহাকে নিয়ে ক ব্লকের এক কামরার বাসায় ভাড়া থাকতেন। আগুনে তার ঘরের সবকিছু পুড়ে গেছে। বুধবার সকালে ঘরের কাছে পুড়ে যাওয়া টিন একপাশে সরিয়ে রাখছিলেন। এই টিন পরে ভাঙারি দোকানে বিক্রি করবেন।
শাওনের বাড়ি শেরপুর সদরে। আগুনে সব হারালেও শাওন বাড়ি ফিরতে চান না। তিনি বলেন, ‘এই পোড়া ছাই সরাইয়া আবার একদিন ঘর উঠব। বেশিদিন লাগব না। আমরা আবার ঘর ভাড়া নিমু। বাড়ি ফিরা যামু সেই উপায় নাই। বাড়ি গিয়া কামকাজ কী করমু?’
স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে এখন তার সব চিন্তা। তাদের আপাতত নিরাপদ আশ্রয়ে রাখতে হবে। তবে আত্মীয়দের কাকে একটু ভরসা করবেন, তা ভেবে পাচ্ছিলেন না শাওন।
তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ক ব্লকের কুমিল্লাপট্টিতে থাকেন দিনমজুর স্বদেশ দাস। স্ত্রী ও সন্তানদের তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। সেখানে কিছুদিন থাকলেও তাদের ফিরে আসতে হবে ঢাকায়। কড়াইলে ঘর পুড়েছে। এখন কম টাকায় কোথায় বাসা ভাড়া পাওয়া যাবে, তারই খবর নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন স্বদেশ।
পাঁচ বছর ধরে বরিশালপট্টিতে ভাড়া থাকেন অটোরিকশা মিস্ত্রি আবদুল জব্বার। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি ভারী কাজ করতে পারেন না।
জব্বার জানান, গ্যারেজ পুড়ে যাওয়ার পরে তিনি নতুন করে কোথাও কাজ পাবেন কি না তা অনিশ্চিত৷ জব্বারের বাড়ি শেরপুর৷ তার পাঁচ মেয়ে। এখন তাদের নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন তা জানেন না।
দুই মেয়ে, এক নাতিকে নিয়ে এক কামরার ঘরে থাকতেন বিলকিস বেগম। তার বয়স্ক ভাতার কার্ড পুড়ে গেছে। বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়ায় কয়েক মাস আগে গৃহপরিচারিকার কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন কষ্ট হলেও তাকে এই পেশায় ফিরতে হবে।
বিলকিস বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘এখন চাইলে বাড়ি যাইতে পারমু না। বাড়ি গেলে ধাক্কায়া বাইর কইরা দিবো। আমরা পোড়া কপাইল্যা। এই আগুন লইয়াই বসবাস করা লাগবো।’
খোরশেদ-সুমি দম্পতিও নিরুপায়। পেশায় গাড়িচালক খোরশেদ বলেন, ‘বাড়ি যামু না, যত কষ্টই হোক। গরীব হইতে পারি কিন্তু কামাই কইরা খাই। ইজ্জত তো আমারও আছে।’
বউবাজারের বাসিন্দা মো. সুমন অগ্নিকাণ্ডের সময় অফিসে ছিলেন। আগুন লাগার খবর পেয়ে দ্রুত কড়াইলে আসেন। মা ও বোনকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে রেখে আসেন। ফিরে এসে দেখেন ঘরের সবকিছু দাউদাউ করে জ্বলছে। সংসারের সব কিছু নতুন করে কিনতে হবে, এ ভেবেই দিশেহারা তিনি।
মহাখালী ডিওএইচএসে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আবু রাশেদ। স্ত্রী ও আট বছরের মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি।
কড়াইল বস্তিতে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেন মো. ফারুক। তার ঘর বনানী এক নম্বর সড়কের কাছে। তার ঘর পোড়েনি। কড়াইল বস্তিতে বারবার আগুনের ঘটনায় বাসিন্দাদের গাফিলতিকে দায়ী করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এইখানে কোনোকিছু নিয়ম মেনে চলে না। নিজেরে তো নিজেই নিরাপদ রাখা লাগব। গ্যাস সিলিন্ডার, গ্যাসের লাইন, ফ্যান, লাইট, সুইচ বোর্ড কেমনে ব্যবহার করতে হয়, সেটা একটু শিখে রাখলে অসুবিধা নাই। কিন্তু এরা এসবে গা করে না। নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনে। কিছু হইলেই অনেকে কয়, নাশকতা। এ ধারণাও মিথ্যা না। রাতে পাহাড়া দেওয়ার সময় অনেক উল্টাপাল্টা লোক দেখি।’
জয়ন্ত সাহা/অমিয়/