দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এইডস রোগীর সংখ্যা। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা বিগত যেকোনো বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আজ ১ ডিসেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব এইডস দিবস। এইডসের কারণে মৃত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, এইডস আক্রান্তদের প্রতি সমবেদনা জানানো ও এইডস সম্পর্কিত জনসচেনতা বৃদ্ধিতে বিশ্বে ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতিবছর ১ ডিসেম্বর দিবসটি পালন করা হয়।
এ দিবসে দেশে বিগত এক বছরের নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ঘোষণা করা হয়ে থাকে। ২০২০ সালে ৬৫৮, ২০২১ সালে ৭২৯, ২০২২ সালে ৯৪৭, ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৭৬ এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৩৮ এইডস রোগী শনাক্ত হয়। জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ১৬ হাজার ৮৬৩ এইচআইভি কেস রয়েছে। যাদের মধ্যে ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২ হাজার ৪২২ জনকে শনাক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ২ হাজার ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার ৩০৯ জন আক্রান্ত রোগী ১৪টি হাসপাতালের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। সরকারি অর্থায়নেই রোগীরা ওষুধসেবা গ্রহণ করছেন। জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ বছর টেস্টিং সেবা সম্প্রসারণ, নির্দিষ্ট জেলাভিত্তিক টেস্টিং সেবা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে টেস্টিং সেবা বৃদ্ধি করায় বেশিসংখ্যক নতুন কেস শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে দিবসটি পালন করা হয়। এ বছর দিবসটি উদযাপনে জাতীয় পর্যায়ে স্ট্যান্ডিং র্যালি ও জাতীয় ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি জেলায় সিভিল সার্জন নিজ উদ্যোগে দিবস উদযাপন উপলক্ষে র্যালি ও আলোচনা সভা আয়োজনের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
সমকামিতার মাধ্যমে ছড়াচ্ছে এইডস
সমকামিতার মাধ্যমে গত এক বছরে চট্টগ্রামে ১৫ জন পুরুষ এইডস আক্রান্ত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা যাকে বলছেন অ্যালার্মিং। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের তত্ত্বাবধানে অ্যান্টি-রিক্টোভাইরাল থেরাপি সেন্টারে (এআরটি) এইডস রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। এই কেন্দ্রের তথ্যমতে, সমকামিতা ছাড়াও গত এক বছরে স্বামী থেকে ১২ জন নারী এইডস আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া একটি শিশু, ২৬ জন সাধারণ জনগণ, ২০ জন অভিবাসী এবং একজন যৌনকর্মী এইডস আক্রান্ত হয়েছেন। এআরটি সূত্রে জানা যায়, গত বছর এই সেন্টারে মোট পরীক্ষা করা হয় ৩ হাজার ৭৬৬ জন রোগীর। এর মধ্যে এইচআইভি পজিটিভ আসে ৭৫ জনের। এ সময়ে ১৩ জন এইডস আক্রান্ত মারা যান। তার আগের দুই বছর অর্থাৎ ২০২২-এর নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রামে এইডস আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫৮ জন ও মারা যান ২৭ জন। ২০২৩-এর নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছিলেন ৮৪ জন এবং মারা যান ১১ জন।
এআরটির একাধিক চিকিৎসক জানান, মারা যাওয়া রোগীরা চিকিৎসা কেন্দ্রে এসেছিলেন অত্যন্ত খারাপ অবস্থা নিয়ে। তারা ওষুধ শুরুর আগেই মারা গেছেন। সমকামিতার মাধ্যমে পুরুষের মধ্যে এইডস ছড়ানোয় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য অশনিসংকেত। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।’
পজিটিভ হওয়া ৭৫ জন আক্রান্তের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা রয়েছেন ৫৩ জন। কক্সবাজারের বাসিন্দা চারজন, ফেনীর সাতজন, রাঙামাটির দুজন এবং কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নাটোর ও নোয়াখালী জেলার বাসিন্দা রয়েছেন দুজন করে।
চমেক হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের প্রধান ডা. জুনায়েদ মাহমুদ খান বলেন, এইডসকে মরণব্যাধি বলা হলেও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার ফলে এ রোগে আক্রান্তরা শুরু থেকে সঠিক চিকিৎসা পেলে সুস্থ হয়ে প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং ফলোআপ চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ নিয়েও সুস্থ থাকা যায়। তা ছাড়া চট্টগ্রামে এখন আগের তুলনায় মৃত্যুসংখ্যাও কমছে। এই রোগে আক্রান্তদের সরকারিভাবে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও আছে।
চমেক হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের সদ্য সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. রফিকুল মওলা জানান, এইচআইভি-এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করলে, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সুচ-সিরিঞ্জ ব্যবহার করলে, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করলে এইচআইভি ভাইরাস ছড়ায়। এ ছাড়া মা থেকে গর্ভাবস্থায় প্রসবের সময় অথবা বুকের দুধপানের করানোর মাধ্যমে সন্তান আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে হাঁচি, কাশি বা থুথুর মাধ্যমে, একই পাত্রে খাবার বা পানি পান করলে, একসঙ্গে ওঠাবসা, খেলাধুলা বা স্পর্শ, হাত মেলালে, জড়িয়ে ধরলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নেই।