নিকষ অন্ধকারে অপশক্তি এসে হানা দেয় বারবার। আবহমান বাংলা সংস্কৃতিচর্চা থেকে বাঙালিকে নিবৃত করতে সে সদা উদ্যত। ক্ষণে ক্ষণে সে ভেঙে দেয় শিল্পীর ঘর; পুড়িয়ে দিয়ে বাদ্যযন্ত্র।
তবুও শিল্পী জীবন থেমে থাকে না। সুরে-সুরে অসুর দমনের প্রত্যয় নিয়ে সে এগোয় কণ্টকাকীর্ণ পথে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশে যখন সংস্কৃতিচর্চা থমকে গেছে, তখন সংস্কৃতিমনা নাগরিকদের স্ব কর্ম-উদ্যোগে জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি সুরক্ষার আহ্বান জানাল ছায়ানট।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর শংকরে ছায়ানট-সংস্কৃতি ভবনের সামনে ‘সংহতি সমাবেশে’ এই আহ্বান আসে।
ছায়ানট ভবনসহ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রধান কার্যালয়, দেশের নানা প্রান্ত বাউল আখড়ায় হামলা-ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে এই সমাবেশে শিল্পী-নাগরিকরা কণ্ঠে তুলে নেন গান। যে গান নিরন্তর মুক্তি সংগ্রামের পথে বাঙালিকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে, নিশানা দিয়েছে নতুন পথের; সে গানেই তারা শঙ্কা নিবারণের প্রত্যাশা করেছেন।
ছায়ানটের শিল্পীরা শুরুতে গান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ও আমার দেশের মাটি’। পরে তারা শোনান বিদ্রোহী কবির ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি।’ একে একে তারা শুনিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’; কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’, ‘মোরা ঝর্ণার মত চঞ্চল’, ‘চল চল চল’ গানগুলো। এই গানগুলো ছাড়াও ফকির লালন সাঁইয়ের ‘মানুষ ছাড়া খ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’; গুরুসদয় দত্তের ‘মানুষ হ, মানুষ হ’; সলিল চৌধুরীর ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা আমার প্রতিরোধের আগুন’; আপেল মাহমুদের ‘তীরহারা এ ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে’; সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ’; শাহ আব্দুল করিমের ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান’ গানগুলো।
ছায়ানটের শিল্পীদের এই সংহতি সমাবেশে সমাজের নানা স্তরের মানুষ যোগ দেন। শিল্পী কৃষ্ণকলি ইসলাম বলেন, ‘অন্ধকারের অপশক্তি আমাদের ভয় পায়। এর কারণ হল, আমাদের গানে আছে ভালোবাসার মন্ত্র; যার বলে আমরা মানুষকে কাছে টানতে পারি। তাই আমাদের প্রতি তাদের এত আক্রোশ। আগুন লাগালে, ভাংচুর করলেও কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয় না। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাধারণ মানুষেরও সম্পর্ক আছে।’
সমাবেশের শেষ পর্যায়ে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ছায়ানটের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. সারওয়ার আলী। তিনি বলেন, ছায়ানট ভবন আক্রান্ত হওয়ার প্রতিবাদে দেশে ও বিদেশের যে অগণিত মানুষ সংহতি জানিয়েছেন ছায়ানট তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।
উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী এবং সাম্প্রতিককালে দেশের বাউলসমাজের ওপরও একটি মহল সহিংস আক্রমণ চালিয়েছে। এই আক্রমণের প্রতিবাদ জানিয়ে ছায়ানট সভাপতি বলেন, ‘এই মহল বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালিয়ে আবহমান বাংলা সংস্কৃতি চর্চা থেকে আমাদের নিবৃত করতে উদ্যত। এসব কর্মকাণ্ড বাঙালি জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির ওপরে আঘাত হানছে।’
গণমাধ্যমের ওপর বেপরোয়া আক্রমণ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে চলা শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত নিরাপরাধ হত্যা দেশবাসীর নিরাপত্তা বিপন্ন করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এমন প্রেক্ষাপটে নাগরিক সমাজের করণীয় নিয়েও বার্তা এসেছে ছায়ানটের বক্তব্যে। সারওয়ার আলী বলেন,’এমন পরিস্থিতিতে আমাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে যোগ্য কর্ম- উদ্যোগ গ্রহণ জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি সুরক্ষায় সমাজকে সক্রিয় করে তুলবে।’
জয়ন্ত/