ঢাকা মেডিকেলে এখানকার পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন। চিকিৎসকরা নিজে থেকেই বারবার এসে রোগীর খবর নিচ্ছেন। ওয়ার্ডের পরিবেশ অনেক সুন্দর হয়েছে। আগে ওয়ার্ডের মধ্যে রোগীর চাপে পা ফেলার জায়গা থাকত না, কিন্তু এখন আর সেই ভিড় নেই। কোনো সরকারি হাসপাতালের এমন সুন্দর চিত্র সত্যই প্রশংসার দাবি রাখে।
সরকারি হাসপাতালের চিরাচরিত উপচে পড়া ভিড় আর মেঝেতে রোগী থাকার দৃশ্য বদলে দিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ। ‘এক শয্যায় এক রোগী’ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধুনিক মডুলার থিয়েটারে সংক্রমণহীন অস্ত্রোপচারের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে এ বিভাগ। কঠোর শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখায় হাসপাতাল থেকে ছড়ানো সংক্রমণের হারও এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগে অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে ‘এক শয্যায় এক রোগী’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ওয়ার্ডগুলো অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং নির্দিষ্ট সময় ছাড়া রোগীর স্বজনদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ।
নিয়ম মানাতে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা মাইকে নিয়মিত নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং পুরো বিভাগটি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগে গিয়ে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫ সালের শুরুতে অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম আকনের উদ্যোগে এখানে প্রথমবারের মতো মডুলার অপারেশন থিয়েটার (ওটি) চালু করা হয়। উন্নত বায়ু পরিশোধন ও পজিটিভ প্রেসার সিস্টেম সংবলিত এ ওটি অত্যন্ত নিরাপদ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এ বিভাগে প্রায় ২ হাজার ৯০০টি বড় ও জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে, যার একটিতেও পরবর্তীতে সংক্রমণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত এক সরকারি হাসপাতালের এমন সাফল্যকে বিরল ও জনস্বাস্থ্যসেবার একটি নতুন মানদণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন জানান, বর্তমানে এ বিভাগে কাগজের ব্যবহার কমিয়ে সম্পূর্ণ কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। নিজস্ব উচ্চক্ষমতার সার্ভার ও ১০০ এমবিপিএস গতির ফাইবার অপটিক লাইনের মাধ্যমে রোগী ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সম্মতিপত্র এবং চিকিৎসার সব পরিকল্পনা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়। ফলে ফাইল হারিয়ে যাওয়া বা তথ্যের অভাবে চিকিৎসায় বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই।
চিকিৎসকরা এখন স্ক্রিনে রিয়েল-টাইম তথ্য দেখে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, যা রোগীদের ভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নামিয়েছে।
চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রেও এসেছে আধুনিকতা। মডুলার ওটির সঙ্গে সংযুক্ত ডিজিটাল ক্লাসরুমের মাধ্যমে প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে বসেই সরাসরি লাইভ অস্ত্রোপচার দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে তারা জটিল বিষয়গুলো হাতে-কলমে শিখতে পারছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অনলাইনে যুক্ত হয়ে এখানে মতবিনিময় করছেন, যা এ বিভাগকে বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছে।
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, রোগীদের দোরগোড়ায় বিশেষায়িত সেবা পৌঁছে দিতে বর্তমানে স্পাইন কেয়ার, পেডিয়াট্রিক অর্থোপেডিকস ও স্পোর্টস মেডিসিনের মতো ক্লিনিক চালু রয়েছে। তবে অদূর ভবিষ্যতে হ্যান্ড সার্জারি, ইলিজারভ ও ডিফরমিটি কারেকশন এবং অর্থোপেডিক অনকোলজির মতো তিনটি সুপার-স্পেশালিটি ক্লিনিক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সেবা চালু হলে সাধারণ মানুষকে আর বিদেশে বা ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হবে না।
তিনি বলেন, হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের নার্সদের অসামান্য সেবার প্রশংসা করেছেন এবং তাদের স্মারক উপহার দিয়ে সম্মানিত করেছেন। প্রতিটি নার্স ও ব্রাদারের অর্থোপেডিক নার্সিং সেবা ও সংক্রমণ প্রতিরোধকারী মডুলার বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া, এ বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ায় রোগীরা এখন সর্বোচ্চ মানের সেবা পাচ্ছেন এবং সংক্রমণের হার শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রয়োজনে এ বিভাগ (অর্থোপেডিক সার্জারি) সবসময় পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ব্যর্থতা-প্রতিরোধী ডিজিটাল সিস্টেম, সংক্রমণ প্রতিরোধকারী মডুলার থিয়েটার এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ৬৩তম বছরে পদার্পণ করা এ বিভাগটি প্রমাণ করেছে যে, সরকারি হাসপাতালেও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়া সম্ভব। এটি জাতির জন্য গর্বের এবং প্রতিটি রোগীর জন্য আশার আলো।
বিভাগের যাত্রার বিষয়ে অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন জানান, ১৯৬৩ সালে বাংলাদেশে আধুনিক অর্থোপেডিকসের পথিকৃৎ প্রয়াত অধ্যাপক ড. ওমর আহমেদ জামালের হাত ধরে এ বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সে সময় মাত্র একজন ধার করা অধ্যাপক এবং গুটিকয়েক শয্যা নিয়ে শুরু হওয়া এ বিভাগটি। গত ৬২ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ বিভাগটি সম্মুখসারিতে থেকে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সে সময় চিকিৎসকরা কারফিউ এবং ব্ল্যাকআউটের মতো চরম বিপদসংকুল পরিস্থিতির মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুলিবিদ্ধ ও বিস্ফোরণে আহত মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ নাগরিকদের চিকিৎসা দিয়েছেন। এমনকি বহু আহত মুক্তিসেনাকে ওয়ার্ডের ভেতর আশ্রয় দিয়ে তাদের প্রাণ বাঁচিয়েছেন এ বিভাগের চিকিৎসকরা।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবেও এ বিভাগের চিকিৎসকরা সেবার সেই একই মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন জানিয়ে অধ্যাপক জাকির বলেন, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় শহরের সবচেয়ে বড় ট্রমা সেন্টার হিসেবে এ বিভাগটি আবারও গুরুদায়িত্ব পালন করে। সে সময় একেকটি শিফটে ৮০টিরও বেশি গুরুতর রোগী সামলাতে হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ছিল গুলিবিদ্ধ বা ছররা গুলিতে আহত। তখন বিভাগের চিকিৎসক ও রেসিডেন্টরা টানা ৯৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ডিউটি করে অসংখ্য মানুষের জীবন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রক্ষা করেছেন।
কঠিন সেই সময়েও তারা সেবার মানসিকতা থেকে একচুলও নড়েননি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের পুরুষ ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ড ইনচার্জ রেজওয়ানা পারভীন জানান, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগে ‘এক শয্যায় এক রোগী’ রাখার মতো নীতি বাস্তবায়ন করার ফলে আমাদের সেবা দিতে অনেক সুবিধা হচ্ছে।
ওয়ার্ডের ভেতরে নির্দিষ্ট সময়ে বেশি রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের ভিড় করতে দেওয়া হয় না। দায়িত্বরত চিকিৎসকরা নিয়মিত মাইক দিয়ে নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। সব নিয়ম কঠোরভাবে পালন করায় এ বিভাগ থেকে ছড়ানো রোগীর সংক্রমণের হার নেই বললেই চলে। এ ছাড়া এ বিভাগে রোগীর জন্য চার রং-এর বিছানার চাদর দেওয়া হয়, ফলে নার্সরা রোগীর চিকিৎসার বিষয়ে সহজেই বুঝতে পারেন।
পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী জিয়াউদ্দিন জানান, এ বিভাগের চিকিৎসকরা অনেক ভালো সেবা দিচ্ছেন। ঢাকা মেডিকেলে আমি আগেও চিকিৎসা নিয়েছি, কিন্তু এখানকার পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন। চিকিৎসকরা নিজে থেকেই বারবার এসে রোগীর খবর নিচ্ছেন। ওয়ার্ডের পরিবেশ অনেক সুন্দর হয়েছে। আগে ওয়ার্ডের মধ্যে রোগীর চাপে পা ফেলার জায়গা থাকত না, কিন্তু এখন আর সেই ভিড় নেই। কোনো সরকারি হাসপাতালের এমন সুন্দর চিত্র সত্যই প্রসংশার দাবি রাখে। সূত্র: বাসস