ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারের উত্তাপ। একই সঙ্গে বাড়ছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা। আবার থেমে নেই নির্বাচন বিধিভঙ্গের কারণে কমিশনের শোকজ-জরিমানা। আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থীদের সশরীরে এসে শুনানিতে জবাবাদিহি করতে হচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘যখন যে প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পাচ্ছি, সঙ্গে সঙ্গে তাকে জবাবদিহির মধ্যে আনা হচ্ছে।
নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনের সব ধরনের প্রচারপত্র সাদা-কালো করার কথা থাকলেও আইন উপেক্ষা করে রঙিন ব্যানার, পোস্টার ও লিফলেটে ছেয়ে যাচ্ছে শহর থেকে গ্রাম। সরকারি স্থাপনা, বিদ্যুতের খুঁটি, এমনকি ধর্মীয় উপাসনালয়ও বাদ পড়ছে না। আইন ভাঙার এই প্রকাশ্য প্রতিযোগিতার মাঝেই প্রশ্ন উঠছে–নির্বাচন কমিশন (ইসি) কী আদৌ আচরণবিধি কার্যকরে কঠোর ভূমিকা রাখতে পারছে? নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ব্যানার-ফেস্টুনে শুধু সাদা-কালো রং ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
ব্যুরো, নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর–
চট্টগ্রাম
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সরেজমিন দেখা যায়, চট্টগ্রাম টেক্সটাইল এলাকায় বায়েজিদ সড়কের পাশে ঝুলছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের রঙিন ব্যানার। এ ব্যানারে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার কথা বলা আছে। একই এলাকায় বিপরীত পাশে রয়েছে চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারী আসনের বিএনপি প্রার্থী মীর হেলালের বিশাল ব্যানার। সেখানেও ধানের শীষে ভোট চাওয়া হয়েছে। বায়েজিদ এলাকায় দেখা যায়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারী আসনের প্রার্থী মাওলানা মতিউল্লা নূরীর ব্যানার। সেখানে তার ছবি ও হাতপাখা মার্কায় ভোট দেওয়ার কথা লেখা রয়েছে।
এর এক কিলোমিটার দক্ষিণে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক্যাল মোড়। সেখানে চট্টগ্রাম-১০ ডবলমুরিং-হালিশহর আসনের বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমানের বিশাল ব্যানার দেখা গেল। এতে ধানের শীষে ভোট চাওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-১০ আসনের জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালীর হালিশহরের বি-ব্লক পানির টাংকির পাশে একটি নির্বাচনি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রার্থীর ছবি ও দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট চাওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-৯ কোতোয়ালি আসনের বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ানের রঙিন ব্যানার লাগানো হয়েছে কাজীর দেউড়ি মোড়ে। সেখানে দলীয় প্রতীকে ভোট চাওয়া হয়েছে।
এভাবে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ৮, ৯, ১০, ১১ আসনসহ ১৬টি আসনের প্রার্থীদের রঙিন ব্যানার ও ফেস্টুন ঝুলছে বিদ্যুতের খুঁটি, দেয়াল, পিলার ও সরকারি ভবনের গেটে। কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর বাঁশের তোরণ তৈরি করে দলীয় প্রতীক ও প্রার্থীর ছবি টাঙানো হয়েছে। প্রার্থীদের বলছেন, পোস্টার ছাড়া নির্বাচনি প্রচার চালানো কঠিন। আবার অনেকেই দায় চাপাচ্ছেন প্রতিপক্ষের ওপর। এক পক্ষ লাগালে অন্য পক্ষও বাধ্য হয়ে নামছে এই পথে।
নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. মো জিয়াউদ্দীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা যখনই খবর পাচ্ছি, তখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি। অনেক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে, জরিমানা করা হয়েছে, সতর্ক করা হয়েছে।’
আর আগে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আলাউদ্দীন শিকদারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ইলেকটোরাল এনকোয়ারি ও অ্যাডজুডিকেশন কমিটি। তাকে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শোকজ করা হয়েছে চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়া আসনের বিএনপির প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে। তাকেও জরিমানা করা হয়।
এদিকে গতকাল চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ আসনের এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বিএনপি প্রার্থী জসীম উদ্দীন আহমেদ। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় এলডিপি প্রার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাকেও সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য নির্দেশ দিয়েছে ইলেকটোরাল এনকোয়ারি ও অ্যাডজুডিকেশন কমিটি।
নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে গত ১৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি আসনে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। একই দিন চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ১৩ জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনের বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি।
বরিশাল
সরেজমিন বরিশালে দেখা গেছে, মহানগর ও উপজেলার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে ‘উঠান বৈঠক’ নামে জনসভা করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রধান সড়ক আটকে মিছিল ও পথসভার আয়োজন করা হচ্ছে। বড় আকারের পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। অতি উচ্চশব্দে মাইকিং, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা এবং অনুমতি ছাড়া পথসভাও চলছে নিয়ম ভেঙে। নির্বাচনি আচরণবিধি ভেঙে পোস্টার, মাইকিং, সরকারি স্থাপনা ব্যবহার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে প্রচার চালাচ্ছেন অনেক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের নেতৃত্বে নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রধান সড়ক আটকে মিছিল বের হয়। এ সময় ব্যস্ত সড়কটিতে সৃষ্টি হয় যানজট। একই দিন সন্ধ্যায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী নগরীর কালিজিরা বাজার এলাকায় গণসংযোগ করেন। এ সময় কয়েক শ নেতা-কর্মী বরিশাল-ঝালকাঠি আঞ্চলিক সড়কের ওপর অবস্থান নেওয়ায় প্রায় আধা ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে গৌরনদী উপজেলার শরিকল ইউনিয়নের সাকোকাঠি এলাকার প্রধান সড়কের মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে পথসভা করেন বিএনপির প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন। এতে ওই সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনি চরসিকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ, মিয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ, সোহনাবাদ একে বিদ্যালয় মাঠ এবং সোহনাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে পৃথক জনসভা করে।
নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বরিশাল-৪ আসনের বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা নিয়মিত স্পিডবোট ব্যবহার করে প্রচার চালাচ্ছেন। একই চিত্র দেখা গেছে বরিশাল-২, বরিশাল-৩ ও বরিশাল-৫ আসনেও।
এ বিষয়ে বরিশালের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচনি আচরণবিধি মানাতে মাঠে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা কাজ করছেন। আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলো জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট টিমের কাছে পাঠানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত ১০টি অভিযোগ পেয়েছি, সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মাঠপর্যায়ে যেসব তাৎক্ষণিক অনিয়ম চোখে পড়ছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সেগুলো দেখছেন। আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।’
রাজশাহী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজশাহীতে একের পর এক নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটিতে ফেস্টুন সাঁটানো, অনুমোদনহীন তোরণ নির্মাণ, ভোটের আগাম প্রচার ও বিতর্কিত বক্তব্যের অভিযোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। একই সঙ্গে একাধিক প্রার্থীকে আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে তলব করা হলেও এসব অনিয়ম থামছে না। গতকাল শনিবারও এক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে।
জানা যায়, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বিএনপি প্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডি এম জিয়াউর রহমানকে শোকজ করা হয়েছে। রাজশাহীর সিভিল জজ এবং নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির প্রধান নওশীন মাহবুব শনিবার (গতকাল) এ নোটিশ জারি করেন। নোটিশে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি বেলা আড়াইটায় আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, বাগমারার ভবানীগঞ্জ পৌরসভার গোডাউন মোড় এলাকায় রাস্তার ওপর তোরণ নির্মাণ করে ধানের শীষের ব্যানার ঝুলিয়ে প্রচার চালানো হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, উত্তর একডালা, দ্বীপপুর, চকেরমোড়, সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটিতে ফেস্টুন ঝোলানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভবনে ব্যানার টাঙানো দেখা গেছে। এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট শামসুজ্জোহা সরকার বলেন, গোডাউন মোড়ে আগে থেকেই একটি পুরোনো তোরণ ছিল, ব্যানার সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রতীক বরাদ্দের আগেই ভোটের আগাম প্রচারের অভিযোগে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মুজিবুর রহমানকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গত ১৮ জানুয়ারি শোকজ করা হয়। অভিযোগ ও ভিডিও ফুটেজে তার উপস্থিতিতে এক উঠান বৈঠকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও প্রকাশ্যে দলীয় প্রতীকে ভোট চাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। এ ঘটনায় তাকে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।
একই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনকে গত ১২ জানুয়ারি শোকজ করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তিনি তানোরে অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের মধ্যে চাদর, মাফলার ও ধানের শীষের পতাকা বিতরণ করেন, যা আচরণবিধির লঙ্ঘন।
অন্যদিকে রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছে ফেস্টুন সাঁটানোর অভিযোগে গত ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি তিন প্রার্থী–ইসফা খায়রুল হক শিমুল (স্বতন্ত্র), ব্যারিস্টার রেজাউল করিম (স্বতন্ত্র) ও জামায়াতের মনজুর রহমানকে আদালতে তলব করা হয়।
এ ছাড়া রাজশাহী-২ (সদর) আসনে প্রতীক বরাদ্দের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানোর অভিযোগে গত ১৪ জানুয়ারি এবি পার্টির প্রার্থী মু. সাঈদ নোমানকেও শোকজ করা হয়েছিল। পরে তিনি সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেন।
খুলনা
তফশিল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মাইক, সিটি করপোরেশনের বিলবোর্ড, ব্যানারে কালার পিভিসি এবং নির্ধারিত মাপের অতিরিক্ত ফেস্টুন ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ইতোমধ্যে খুলনা জেলার ছয়টি আসনের দুজন প্রার্থী, চারজন শিক্ষকসহ আটজনের বিরুদ্ধে কারণ দর্শাও (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রার্থীসহ আরও কয়েকজনকে সতর্ক করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মনিটরিং না থাকায় এর বাইরেও অনেক ঘটনা আছে, সেসব নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়নি।
জানা যায়, খুলনার কয়রা উপজেলায় নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩০ ডিসেম্বর কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ওলিউল্লাহ, ঘুগরাকাটি ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার ইংরেজি প্রভাষক মো. শরিফুল ইসলাম, একই মাদ্রাসার সহকারী মৌলবি মাওলানা রফিকুল ইসলাম এবং বেজপাড়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক নজরুল ইসলামকে শোকজ করা হয়েছে। খুলনা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের পক্ষে নির্বাচনি জনসভার আয়োজন এবং তাতে অংশগ্রহণের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির সদস্য ইয়াসমিন নাহার স্বাক্ষরিত শোকজ নোটিশে বলা হয়, নির্বাচনকালীন আচরণবিধি অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে সভা-সমাবেশ বা প্রচারে অংশ নিতে পারেন না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
একইভাবে ২৭ জানুয়ারি নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে খুলনা-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি।
নোটিশে রকিবুল ইসলাম বকুলকে ১ ফেব্রুয়ারি খুলনা যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৩-এর কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, দৌলতপুর ও খালিশপুরে প্রচারের সময় প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুলের পক্ষে তিনটির অধিক মাইক ব্যবহার, সিটি করপোরেশনের বিলবোর্ড ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কালার পিভিসি ব্যবহার করা হচ্ছে।
খুলনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আ স ম জামশেদ খোন্দকার বলেন, সব দলের প্রার্থীদের নির্বাচনি আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিলেট
সিলেট- ১ আসনে নগরজুড়ে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ছড়াছড়ি চলছে। তবে নগরজুড়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের এসব চিত্র নজরে আসছে না নির্বাচন কমিশন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের। আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে কোনো প্রার্থীকে দণ্ড দেওয়া তো দূরের কথা, কাউকে কারণ দর্শানো নোটিশ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তাই প্রার্থীদের বিধি লঙ্ঘনে প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় সাধারণ ভোটারদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিলেট নগরীতে সবচেয়ে বেশি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সুমন। তিনি সিলেট নগরীর রিকাবীবাজার, বন্দরবাজার, চৌহাট্টা, শাহি ঈদগাহ, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়, ফুটওভার ব্রিজের ওপর রঙিন পিভিসির বড় বড় বিলবোর্ড সাঁটিয়েছেন।
বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির নগরীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পিভিসি ব্যানার ও বিলবোর্ড সাঁটিয়েছেন। পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় রঙিন পোস্টার সাঁটিয়েছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান নগরীজুড়ে থাকা বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি, সড়ক বিভাজকের বেড়া, গাছের মধ্যে ব্যানার-ফেস্টুন সাঁটিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান নগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক বিভাজকের বেড়ায় পিভিসি ব্যানার ফেস্টুন সাঁটিয়েছেন। এ ছাড়া সিলেট-১ আসনের প্রায় সব প্রার্থীই ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড সাঁটিয়ে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন।
আচরণবিধির লঙ্ঘন গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও সিলেটের স্থানীয় মাঠ প্রশাসন প্রার্থীদের এসব আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাকে আমলে নিচ্ছে না।
এ ব্যাপারে আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস, সিলেটের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা সাইদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি আমরা দেখছি না, সেটি রিটার্নিং কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) দেখছেন।
এ ব্যাপারে সিলেট-১ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সাঈদা পারভীন খবরের কাগজকে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাপারটা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দেখেন। তিনি এ বিষয়ে বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহার মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
নোয়াখালী
নোয়াখালী-১ আসনে ঘরে ঘরে ধানের শীষের রঙিন লিফলেট বিতরণ করছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও তার সমর্থকরা। এতে দলীয়প্রধান ছাড়াও প্রতিষ্ঠাতাসহ একাধিক ছবি ব্যবহার করা হলেও প্রশাসনের নীরব থাকার অভিযোগ উঠেছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) এই আসনের চাটখিল ও সোনাইমুড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চার রঙের ধানের শীষের লিফলেট বিতরণ এবং রঙিন স্টিকার দেয়ালে সাঁটাতে দেখা গেছে।
লিফলেট ও স্টিকারে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং ধানের শীষের প্রার্থী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ছাড়াও জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনের আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও লিফলেট ও স্টিকারে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা, সংখ্যা ও তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। গত ৯ দিনে এসব লিফলেট ও স্টিকার চাটখিল ও সোনাইমুড়ী এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনকে ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। মোবাইলে খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
তবে তার ব্যক্তিগত সহকারী মো. ইকবাল হোসাইন রুবেল খবরের কাগজকে বলেন, ধানের শীষের রঙিন লিফলেট বিতরণের অভিযোগ সত্য নয়। আগের ছাপানো কোনো রঙিন লিফলেট কেউ হয়তো বিতরণ করতে পারে।
ছবিতে বিএনপি প্রার্থীর হাতেও এমন লিফলেট দেখা গেছে বলার পর তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’
সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আবু তালেব বলেন, ‘রঙিন লিফলেট ও গেট নির্মাণের কথা আমিও শুনেছি। কিন্তু নির্বাচনি আচরণবিধির বিষয়টি দেখছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।’
জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনে কী করা যাবে, কী করা যাবে না–স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সেটি যদি কেউ না মানেন, সংশ্লিষ্ট প্রার্থী বা তার এজেন্ট যারা আছেন, আমরা তাদের নজরে আনব এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট
নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে এরফান আলী নামে এক সরকারি কর্মচারীকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে ভোলাহাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. শামীম হোসেনের নেতৃত্বে উপজেলার বীরেশ্বরপুর গ্রামে এই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। দণ্ডিত ব্যক্তি ওই গ্রামের মৃত ইলিয়াস আলীর ছেলে।
মোবাইল কোর্টের বিচারক মো. শামীম হোসেন বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী এরফান আলী বীরেশ্বরপুর গ্রামে নিজ বাসভবনে খাবারের আয়োজন করেন এবং নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছিলেন। এমন সংবাদ পেয়ে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর ২১(খ) ধারা লঙ্ঘনের অপরাধে এরফান আলীকে ২৭(ক) ধারায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।