দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফলে গণপিটুনি বা মব সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় গত মাসে (জানুয়ারি ২০২৫) এই বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যাও বেড়েছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) দেওয়া গত মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং নিজেদের অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করে এমএসএফ।
এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মব-সন্ত্রাসে মানুষ হত্যার ঘটনা এ সরকারের আমলে বেড়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে মব বা গণপিটুনির ২৮টি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১ জন এবং আহত হয়েছেন ২৬ জন। গত ডিসেম্বরে এ ধরনের ২৪টি ঘটনায় নিহত হন ১০ জন এবং আগত হন ৩৪ জন। পাশাপাশি গত জানুয়ারি মাসে ৫৭টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে। ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ৪৮। এ ছাড়া গত ডিসেম্বরে কারা হেফাজতে ৯ জন মারা গেলেও গত মাসে জানুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৫ জন।
এমএসএফ বলেছে, এক মাসের ব্যবধানে গণপিটুনির ঘটনায় জানুয়ারিতে নিহত ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। মানবাধিকার সংগঠনটি মনে করে, আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ, যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই গণ্য হয়ে থাকে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া সমাজে সহিংসতা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কা জোরদার করে।
মামলায় আসামির সংখ্যা বেড়েছে
এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে অর্ধেকে নেমে এলেও (১৬ থেকে ৮), সরকার পতনের পর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নামোল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ১২০ এবং অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ১১০ থেকে বেড়ে ৩২০ হয়েছে।
এমএসএফ বলছে, এ অবস্থা আইনগত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণমামলার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতা
রাজনৈতিক সহিংসতায় গত জানুয়ারি মাসে আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে আহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে নির্বাচনি সহিংসতার ৬৪টি ঘটনায় ৫০৯ জন আহত এবং ৪ জন নিহত হয়েছেন। ডিসেম্বরে ৭টি ঘটনায় ৯৭ জন আহত এবং ১ জন নিহত হয়েছিলেন। জানুয়ারিতে দুষ্কৃতকারীদের হামলায় ৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন, যেখানে ডিসেম্বরে নিহত হয়েছিলেন ৪ জন।
এমএসএফ বলছে, দুষ্কৃতকারীদের হামলায় নিহত ও আহতের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রাজনৈতিক সহিংসতায় নৃশংসতা বৃদ্ধির দিকটি নির্দেশ করে। নির্বাচনি সহিংসতা ছিল জানুয়ারি মাসের অন্যতম সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট।
সংখ্যালঘু নির্যাতন
গত মাসে বেড়েছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাও। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে প্রতিমা ভাঙচুর, বাড়িঘর ভাঙচুর, মামলাসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। অথচ ডিসেম্বরে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ৪টি।
এমএসএফ বলছে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রতিমা ভাঙচুর, অগ্নিকাণ্ড ও হামলার ঘটনা জানুয়ারি মাসে স্পষ্টভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পুনরুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।
এ ছাড়া গত মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দুটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি এসব বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে একজন নিহত হয়েছেন। এমএসএফ বলেছে, নির্যাতনে মৃত্যুর সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় স্পষ্ট হয় যে হেফাজতে নির্যাতন এখনো একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান।
দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে এমএসএফ বলেছে, জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও জটিল, সহিংস ও উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করে। প্রায় সব প্রধান মানবাধিকার সূচকেই জানুয়ারি মাসে ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনটি মনে করে, মানবাধিকারের এ চিত্র রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারাবাহিক প্রভাবকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।