নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের চলমান টানা কর্মবিরতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বন্ধ রয়েছে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম। বন্দর ইয়ার্ড থেকে ডেলিভারি কমায় ইয়ার্ডে বেড়েছে কনটেইনারের সারি। অপরদিকে বিভিন্ন বেসরকারি ডিপোতেও বাড়ছে কনটেইনার।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। চলবে আগামীকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত।
বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের দাবি, এনসিটি বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পৃথক আদেশে ৩১ জনকে বদলি করা হয়েছে। এই বদলি আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি বিডার আশিক চৌধুরী, বন্দর চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামান ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুকের অপসারণ ও তাদের বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানান তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খোকন খবরের কাগজকে বলেন, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করা হয়েছে। কর্মবিরতির সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত টানা কর্মবিরতি চলবে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও বন্দর শ্রমিক দল নেতা হুমায়ুন কবীর বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষ অন্যায়ভাবে বদলি আদেশ দিচ্ছে এই আন্দোলন দমন করার জন্য। আমরা অবিলম্বে এ অন্যায় বদলি আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। বিডার আশিক চৌধুরী, বন্দর চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামান ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুকের অপসারণ দাবি করছি। তাদের বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানাচ্ছি।
ইয়ার্ডে বেড়েছে কনটেইনার, কমেছে ডেলিভারি
শ্রমিক-কর্মচারীদের চলমান কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বন্দর ইয়ার্ডে বেড়েছে কনটেইনার, পাশাপাশি কমছে ডেলিভারি।
চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রাফিক বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার সংখ্যা বেড়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি বন্দর ইয়ার্ডে ৩২ হাজার ১১১ টিইইউএস কনটেইনার ছিল। গত ১ ফেব্রুয়ারি সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৮৭৩ টিইইউএসে। গত ২ ফেব্রুয়ারি আরও বেড়ে ঠেকেছে ৩৭ হাজার ৩০৭ টিইইউএসে।
অপরদিকে বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারির হারও কমে গেছে। গত ৩১ জানুয়ারি বন্দর থেকে ৩ হাজার ১০২ টিইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হয়। গত ১ ফেব্রুয়ারি কনটেইনার ডেলিভারির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৫০ টিইইউএসে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি বন্দর থেকে ডেলিভারি আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৮৪ টিইইউএসে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি ডিপোতেও আমদানি, রপ্তানি ও খালি কনটেইনারের সংখ্যা বাড়ছে।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এনসিটি রক্ষার আন্দোলনের গতি কমে আসে। তবে গত ২৯ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই রায়কে কেন্দ্র করে অফিস চলাকালীন চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবনে এবং বন্দর ভবন এলাকায় মিছিলে অংশ নেন। এরপর থেকে দিনে দিনে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন আরও চাঙ্গা হয়ে ওঠে৷
যদিও সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশের জন্য অনুকূল না হলে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়া হবে না।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এখনো চুক্তি হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন- যদি আমাদের জন্য অনুকূল হয় তবে চুক্তি হবে, অনুকূল না হলে হবে না। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি এ সরকার করবে না।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। একদিকে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অপরদিকে রমজানে ভোগ্যপণ্যের সংকট দেখা দিতে পারে৷ আমাদের পোশাকশিল্পের মালিকরা অনেক বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে জিম্মি করে যা চলছে, এটা সরকারকেই মোকাবেলা করতে হবে। সরকার না পারলে যারা দায়িত্ববান বিশেষ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দিতে হবে। তারাও না পারলে তাদের সবাইকে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমাদের চাওয়া, বন্দরের অপারেশন সিস্টেম স্বাভাবিক হোক। চারদিন ধরে বন্দর অচল করে রাখা হয়েছে। সরকারের নীরব ভূমিকা দেখে আমরা আশ্চর্য হই। সরকার যদি নীরব ভূমিকা পালন করে তাহলে এর দায়ভার সরকার এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে।
তারেক মাহমুদ/অমিয়/