অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের শেষ কর্মদিবসে সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন পরিণত হয়েছিল আত্মসমালোচনা, আত্মপক্ষসমর্থন আর আবেগঘন বার্তার অনন্য মঞ্চে । বিদায়ের ক্ষণে কেউ অপূর্ণতার দায় নিজের কাঁধে তুলে নেন, কেউ নিজের কাজকে নম্বর দিয়ে মূল্যায়ন করেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে অনুরোধ করেন, তাকে যেন ভুলে যাওয়া হয়।
ভূমি ও খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেন, ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রমকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার উদ্যোগ সফল হয়নি। জনগণের ভোগান্তি কমাতেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বলে জানান তিনি। বিষয়টি সর্বোচ্চ পর্যায় প্রধান উপদেষ্টা পর্যন্ত নেওয়া হলেও সরকারের ভেতরে প্রয়োজনীয় সমর্থন মেলেনি। তবে কারও দিকে আঙুল না তুলে তিনি বলেন, ‘ব্যর্থতার দায়ভার আমি নিচ্ছি।’ বিদায়ের মুহূর্তে ভেতরের মতপার্থক্য নিয়ে তিক্ততা বাড়াতে চান না বলেও মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে খাদ্য মজুতের ক্ষেত্রে তিনি আশাবাদী চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশে বর্তমানে ২২ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যা নিরাপদ সীমার চেয়েও বেশি। ফলে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিতে হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উপদেষ্টাদের মধ্যে বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বিদায় বেলায় আবেগঘন বক্তব্য দিয়ে বলেন, ‘নতুন সরকার গঠনের পরপরই তিনি পেশাগত জীবনে ফিরে যাবেন। আমার ভুলত্রুটি থাকতেই পারে, ক্ষমা করবেন। শেষ অনুরোধ, দয়া করে আমাকে ভুলে যাবেন।’
তিনি দাবি করেন, ছোট খামারি থেকে বড় উদ্যোক্তা, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত রেখে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্ন ও অনুসন্ধান তাকে জবাবদিহির মধ্যে রেখেছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ নিজের কাজের মূল্যায়নে দিয়েছেন ১০০-তে ৭০ নম্বর। কিছু কিছু কাজের ব্যর্থতার দায় নিয়ে তিনি বলেন, ‘সব কাজ শেষ করতে পারিনি। অন্তর্বর্তী সময়ে কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘদিনের অনিয়ম বড় বাধা ছিল। এনবিআর সংস্কার, ব্যাংক খাতের আস্থাহীনতা, খেলাপি ঋণ ও মূল্যস্ফীতি–এসব চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।’ তবে করনীতির একটি গাইডলাইন প্রতিবেদন রেখে যাচ্ছেন, যা ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নতুন করে সব আবিষ্কার না করে ইতোমধ্যে নেওয়া উদ্যোগগুলো সংহত করতে।
ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন নিজের মূল্যায়নে ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। তিনি দাবি করেন, ৯৫ শতাংশ সফল হয়েছেন। অনুদান শাখার মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তা, পাগলা মসজিদের তহবিল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ওয়াকফ প্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ–এসবকে তিনি বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও প্রশাসনিক জটিলতা ও জনবল সংকটের কথা স্বীকার করেন।
মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও নৌপরিবহন খাতেও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা আইন, নীতিমালা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও রাজস্ব বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরেন।
সব মিলিয়ে বিদায়ী দিনটি ছিল দায়িত্ব পালনের একধরনের আত্মমূল্যায়ন, যেখানে অপূর্ণতা ও অর্জন পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে। নতুন সরকারের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে উপদেষ্টাদের এই বক্তব্যগুলো ভবিষ্যতের এমন বার্তা যে কাজ শুরু হয়েছে, এখন তার পরিণতি নির্ভর করবে ধারাবাহিকতার ওপর।