রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন নগর এলাকায় হঠাৎ করেই মশার উপদ্রব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মশার কামড়ে অতিষ্ঠ মানুষ। নিচতলায় তো আছেই, বহুতল ভবনের ওপরের তলাগুলোও রেহাই পাচ্ছে না। মশার কামড়ে ত্বক ফুলে যাওয়া, তীব্র চুলকানি ও অস্বস্তি এখন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। বাসিন্দাদের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর উদাসীনতা এবং মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় পরিস্থিতি দিনদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মশা সাধারণ মানুষকে এতটাই অতিষ্ঠ করেছে যে তা গড়িয়েছে হাইকোর্ট পর্যন্ত। সাত দিনে ব্যবস্থা না নিলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রিট করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা ও ধানমন্ডি–সব এলাকাতেই একই চিত্র। সন্ধ্যার পর মশার আক্রমণ অসহনীয় হয়ে ওঠে, তবে এখন দিনে-দুপুরেও ঘরের ভেতরে মশার উপদ্রব দেখা যাচ্ছে। কয়েল, অ্যারোসল, বৈদ্যুতিক ব্যাট কিংবা মশারি ব্যবহার করেও পুরোপুরি সুরক্ষা মিলছে না। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২৪৩ জন; এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ পুরুষ ও ৩৬ শতাংশ নারী। এ বছর চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জনে, মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মারা যান ৫৭৫ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশার প্রকোপ কিছুটা কমলেই কিউলেক্স মশার দাপট বাড়ছে। নতুন বছরের শুরু থেকেই কিউলেক্সের আধিক্য বাড়তে শুরু করেছে, যা মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) দাবি করছে, নিয়মিত ওষুধ ছিটানোসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, আগে দুই-তিন দিন পরপর মশক নিধন কর্মীদের দেখা মিললেও এখন মাসেও দেখা যায় না। অনেক ওয়ার্ডে ৮ থেকে ১৩ জন করে কর্মী থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে মাঠে তাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে।
বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নিয়মিত স্প্রে কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। কলাবাগানের বাড়িওয়ালা জিল্লুর রহমান টিটু বলেন, টাকা দিয়েও মশক নিধন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। আগে স্প্রে করতে আসত, এখন আর আসে না। মহাখালীর আমতলীর বাসিন্দা বাবর আলী জানান, পাঁচতলার ওপরে থাকলেও মশার হাত থেকে রেহাই নেই। সন্ধ্যার সময় ঘরে মৌমাছির মতো মশা ভিড় করে, সারাক্ষণ মশারি টানিয়ে থাকতে হয়।
কারওয়ান বাজারের মুদি দোকানি রমজান আলী জানান, এলাকায় মশার উপদ্রব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েলের চাহিদাও অনেক বেড়েছে। আগের তুলনায় কয়েল দ্বিগুণ বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই একসঙ্গে বেশি করে কিনে রাখছেন। সন্ধ্যার পর দোকানে শুধু কয়েল আর অ্যারোসলের খোঁজই বেশি থাকে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগ পর্যন্ত মশক নিধন কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে প্রশাসনিক পরিবর্তন ও জনপ্রনিধিদের অব্যাহতির পর তদারকিতে শৈথিল্য আসে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দুর্বল প্রশাসনিক জটলার প্রভাব নাগরিক সেবাতেও পড়ে। নির্বাচনের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অনেক ওয়ার্ডে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে।
অন্যদিকে ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনে শীর্ষ পদে একের পর এক রদবদল এবং তীব্র অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থ ছাড় না হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে আছে। নিয়মিত নাগরিক সেবার খাতগুলোতে তদারকি কমে গেছে। মশার উপদ্রব বাড়লেও কোনো কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে তদারকি করছেন না বলে অভিযোগ করছেন এলাকাবাসী।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, ৫৪টি ওয়ার্ডে চলতি অর্থবছরে মশা নিধনে প্রায় ১১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যার মধ্যে ৬৫ কোটি টাকা কীটনাশক কেনায় ব্যয় করার কথা। অন্যদিকে ডিএসসিসি বরাদ্দ রেখেছে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে সেই বরাদ্দের কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নাগরিকরা।
এদিকে ডিএসসিসি জানিয়েছে, এডিস ও কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণে বছরব্যাপী কর্মসূচি রয়েছে এবং বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ফগিং নয়, লার্ভা ধ্বংস, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। সামনে ডেঙ্গুর মৌসুম। আগেভাগে সমন্বিত প্রস্তুতি না নিলে আবারও ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘নতুন যোগ দিয়েছি, বেশি দিন হয়নি। তবে যোগ দেওয়ার পর মশক নিধনের দায়িত্ব পেয়েছি। সে লক্ষ্যে কাজ করছি। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৩ জন করে মশক নিধন কর্মী কাজ করছেন।’ তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ঝুকিপূর্ণ, সাধারণ এলাকা ও স্বাভাবিক এলাকার বিবেচনায় মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। নির্বাচনের পরে পরিবেশ এখনো স্বাভাবিক হতে সময় লাগছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
নগরপরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, জনপ্রতিনিধি না থাকায় সাধারণ মানুষ অভিযোগ জানানোর কার্যকর পথ পাচ্ছেন না। অনেক অভিযোগ নগর ভবন পর্যন্ত পৌঁছায় না। তিনি বলেন, প্রশাসক নিয়োগ দিলেও ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকর তদারকি নেই। মশক নিধনে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, কিন্তু জনগণ সুফল পাচ্ছে না। এ জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে জনগণের অর্থ ব্যয় হলেও কার্যকর প্রতিকার মিলবে না। দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার ওপরও এই পরিকল্পনাবিদ জোর দেন।
এদিকে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে উচ্চ আদালতে রিট করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে এতে।
গতকাল ঢাকার জজ কোর্টের আইনজীবী এইচ এম রাশদুল ইসলাম ডাকযোগে নোটিশ পাঠান। তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট আবেদন করা হবে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ডিএনসিসি এলাকায় এডিস ও কিউলেক্স মশার অস্বাভাবিক বিস্তারের কারণে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ বেড়েছে, যা নাগরিকদের জীবন ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১ এলাকায় বসবাসকালে রাশদুল ইসলাম নিজেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। একই বছরের ৩১ অক্টোবর অ্যাডভোকেট জান্নাতি রেহানা (জয়া) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
নোটিশে মশা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও বিধিবদ্ধ দায়িত্বে গাফিলতি হিসেবে উল্লেখ করে একে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন বলা হয়েছে।