ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে আটকে আছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। নিরাপত্তা ঝুঁকিতে জাহাজটি বন্দর ছাড়তে পারছে না। এতে জাহাজে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক উদ্বেগে আছেন।
জানা গেছে, কাতারের মেসাইয়েদ বন্দর থেকে প্রায় ৩৮ হাজার ৮০০ টন ইস্পাত কয়েল নিয়ে জাহাজটি জেবেল আলিতে পৌঁছায়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ও নৌ-চলাচলে সতর্কতা জারির কারণে পণ্য খালাস বিলম্বিত হয়েছে। এতে জাহাজটি বন্দরে অবস্থান করছে।
এমভি বাংলার জয়যাত্রাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে মোট পাঁচটি জাহাজে প্রায় ১০০ জন বাংলাদেশি নাবিক অবস্থান করছেন। তাদের পরিবারও উদ্বেগে রয়েছে।
এদিকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাচ্ছে। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর অনেকেই বিকল্প রুট ব্যবহার করছে। কেউ কেউ সাময়িকভাবে যাত্রা স্থগিত রেখেছে। নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি থাকবে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজে থাকা ৩১ জন নাবিক নিরাপদ আছেন। তারা নিয়মিতভাবে করপোরেশন ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। জাহাজে পর্যাপ্ত খাদ্য, পানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মজুত রয়েছে।
সরকার পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। প্রয়োজনে কূটনৈতিক সহায়তা ও অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি রয়েছে।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটকে থাকা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন জাহাজের ক্রুদের পরিস্থিতি সরকার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ক্রুরা সাহস, ধৈর্য এবং পেশাদারত্ব প্রদর্শন করছে। জেবেল আলি বন্দরে জাহাজের নাবিকরা সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাহসিকতা এবং সংযমের সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএসসি ভার্চুয়াল মাধ্যমে জাহাজের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে।’
তিনি বলেন, ‘ক্রু এবং তাদের পরিবারের জন্য সহায়তা সমন্বয়ের জন্য চট্টগ্রামে বিএসসির সদর দপ্তরে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ সেল স্থাপন করা হয়েছে। মনোবল বজায় রাখার জন্য জাহাজে মানসম্পন্ন খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুবাইয়ের বাংলাদেশ দূতাবাসকেও অবহিত করা হয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। প্রয়োজনে সহায়তা করতে স্থানীয় এজেন্ট ও প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সংকট কাটিয়ে উঠলে জাহাজ বাংলাদেশের দিকে রওনা দিবে।’
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ৫টি জাহাজে বাংলাদেশের প্রায় ১০০ নাবিক আটকা পড়েছেন। এর মধ্যে জয়যাত্রাতে রয়েছেন ৩১ জন নাবিক। এখন পর্যন্ত সবাই সুস্থ রয়েছেন। তবে তাদের উৎকণ্ঠা কমছে না। আমরা তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছি। তারা জীবনবাজি রেখে সমুদ্র পথে কাজ করছেন। নাবিকদের অবদান স্বরণীয়।’
বিশেষজ্ঞরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে পারে। ইস্পাত, জ্বালানি ও কাঁচামাল পরিবহনে বিলম্ব হলে শিল্প খাতে চাপ তৈরির শঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যয়ের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জেবেল আলিতে বাংলাদেশের জাহাজ আটকে পড়ার ঘটনা ওই বৈশ্বিক সংকটেরই প্রতিফলন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জাহাজটি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।