সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় দলীয় প্রভাবমুক্ত, বস্তুনিষ্ঠ এবং সত্যনিষ্ঠ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ‘খবরের কাগজ’-এর প্রকাশক ও সম্পাদক মোস্তফা কামাল।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতাকে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দলের লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত হতে হবে। তবেই গণমাধ্যম প্রকৃত শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।
শনিবার (১৩ জুন) সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে ডেইলি স্টার ভবনে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত ‘গণমাধ্যম কমিশন: সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমানের সঞ্চালনায় এই মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, কমিশনের দুই সদস্য অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, জিমি আমির। উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন ওনার্সের মহাসচিব আব্দুস সালাম, দ্য ফাইনান্সিয়্যাল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, সমকালের সম্পাদক শাহেদ মোহাম্মদ আলী, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক সাখাওয়াত লিটন, চ্যানেল আইয়ের নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, প্রথম আলোর উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি, দৈনিক সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম, যশোরের সংবাদপত্র লোকসমাজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আনোয়ারুল কবির নান্টু, গ্রামের কাগজের সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন, প্রকাশিতব্য দৈনিক ওয়াদার প্রধান সম্পাদক শফিকুল আলম।
সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন প্রক্রিয়া, এর পরিধি এবং কমিশনের কাছে অংশীজনদের প্রত্যাশার ব্যাপারে সুস্পষ্ট মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরা ছিল এমআরডিআইয়ের সভার মূল উদ্দেশ্য।
হাল আমলে ফেক নিউজ বা ভুয়া সংবাদের ছড়াছড়ি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মোস্তফা কামাল দাবি করেন, গত তিন বছরে বিভিন্ন গবেষণায় ‘খবরের কাগজ’ ফেক নিউজ মুক্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এরপরও গণমাধ্যমকে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘একটি পত্রিকা ডিক্লারেশন নেওয়ার পর সরকারি অনুমোদন পায়। অথচ এরপরও মিডিয়াভুক্ত হওয়ার নামে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। মাসে আড়াই কোটি টাকা খরচ করে একটি প্রতিষ্ঠান চালানোর পর আবার কেন বারবার যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়তে হবে?’ তিনি সরকারি সংস্থাগুলোর এই কার্যক্রমকে এক ধরনের ‘হয়রানি’ হিসেবে অভিহিত করেন।
সরকার গঠিত মিডিয়া কমিশন প্রসঙ্গে সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, গণমাধ্যমকে কেবল বিশেষ কোনো রাজনৈতিক লাইনের অনুসারী বা প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অনেক সময় একই ধরণের সংবাদের জন্য নির্দিষ্ট গণমাধ্যমকে যেভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, অন্য গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে তা করা হয় না। এই বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান তিনি।
সবশেষে তিনি সাংবাদিকদের পেশাদারিত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, অতীতের মতো সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম থাকলে গণমাধ্যম অনেক বেশি শক্তিশালী থাকে। সাংবাদিকরা যদি কোনো দলের অনুসারী না হয়ে নিছক পেশাদার হিসেবে কাজ করেন, তবেই দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক সাংবাদিকতা সম্ভব হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থ বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, সত্য ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করাই হোক সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য।
দেশে সাংবাদিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি কার্যকর ও স্বাধীন ‘ইউনিফাইড ইনস্টিটিউশন’ (একীভূত প্রতিষ্ঠান) গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে প্রেস কাউন্সিল বিলুপ্ত করার কথা বলা হলেও ২৬-এর আইজেক খসড়ায় প্রেস কাউন্সিলকে রেখে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সারা হোসেন একে ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘একদিকে গণমাধ্যম কমিশনকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, আবার ৫০ বছরের পুরনো প্রেস কাউন্সিলকেও রাখা হচ্ছে। এতে কাজের ওভারল্যাপিং হবে। একটি ‘ইউনিফাইড ইনস্টিটিউশন’ বা একীভূত প্রতিষ্ঠান হওয়াই সবচেয়ে যৌক্তিক।’
আইজেক খসড়ায় নির্বাচক কমিটিতে কেবল একজন সরকারি প্রতিনিধি (ক্যাবিনেট সেক্রেটারি) রাখার ইতিবাচক দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের অভিজ্ঞতার আলোকে এই সিলেকশন প্রক্রিয়া যেন অত্যন্ত স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও আন্তর্জাতিক মানের হয়, তা বিধিমালায় স্পষ্ট করতে হবে।’ এছাড়া ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেন দুই বছর পার হলেই নিয়োগ না পান, সেই অযোগ্যতার ধারাটি কঠোর করার তাগিদ দেন তিনি।
মোবাইল জার্নালিজমের এই যুগে সাংবাদিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট শিক্ষাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করার বিরোধিতা করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘যোগ্যতা নির্ধারণ যেন কোনোভাবেই লাইসেন্সিং-এর মতো না হয়ে দাঁড়ায়। এটি বাধ্যতামূলক না করে বরং প্রশিক্ষণ, প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ও অ্যাক্রেডিটেশনের সুযোগ রাখা উচিত।
আইজেকের খসড়ায় কমিশনকে জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। দেশের অতীত প্রেক্ষাপট ও সাংবাদিকদের ওপর জুলুম-হয়রানির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সারা হোসেন বলেন, ‘ফাইন বা জরিমানা করাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ এটি অন্য কোনো বড় সাজা বা হয়রানির চেয়ে ভালো।’
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘কনফিডেনশিয়ালিটি অব সোর্সেস’ বা সোর্সের গোপনীয়তা সুরক্ষার ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ যেন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান
গণমাধ্যম খাতে যে নৈরাজ্য বিরাজ করছে, তার উল্লেখ করে কামাল আহমেদ বলেন, ‘এই নৈরাজ্যের মধ্যে কেবল একটি কমিশন কাজ করতে পারবে না। গণমাধ্যম খাতে যে সীমাহীন বিশৃঙ্খলা, আগে সেখানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো নীতিমালা বা স্বচ্ছতা ছাড়াই প্রতিষ্ঠান খোলার যে প্রবণতা, তা বন্ধ করতে হবে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন থেকে আগেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে জানান কামাল আহমেদ। তার মতে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
একটি হাউসের নিয়ন্ত্রণে থাকা গণমাধ্যমের সংখ্যা সীমিত রাখা; দৈনিক পত্রিকার সার্কুলেশন এবং টেলিভিশনের টিআরপি নির্ধারণে শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিদর্শন ব্যবস্থায় নাগরিক সমাজ ও বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং পত্রিকাগুলোর টার্নওভার ট্যাক্স ও অডিট রিপোর্ট যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সার্কুলেশন ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নিয়ে আবারও তিনি গণমাধ্যমের মালিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, ‘কমিশনকে কেবল ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে কাজ করতে হবে এবং এর আইনি ভিত্তি এমন হতে হবে যেন সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
জয়ন্ত সাহা/এসএন