জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিয়ে রবিবার (১৫ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনটি ছিল রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কে উত্তপ্ত। বিশেষ করে সংসদীয় কার্যক্রম শুরু হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চলে ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক। অনির্ধারিত আলোচনায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব সংবিধানে নেই, বিরোধী দলকে এ বিষয়ে কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনার প্রস্তাব দেন তিনি।
প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারের বিভিন্ন নীতিগত ঘোষণা, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা শুরু, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়েছে এবং কমিটিকে আগামী ২ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন পেশ করতে বলা হয়েছে।
এর আগে বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতেই প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য দেন মন্ত্রীরা। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য ৮টি এবং অন্যান্য মন্ত্রীর জন্য ৪৬০টিসহ মোট ৪৬৮টি প্রশ্ন জমা পড়েছে। এ ছাড়া জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের ২৭টি নোটিশ এবং সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ৯৭টি নোটিশও পাওয়া গেছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন জানান, বিগত সরকারের আমলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নানা অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি ছিল। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে ভাতা পৌঁছে দিতে বিদ্যমান তালিকা পুনর্বিবেচনা করা হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সব ভাতাকে সমন্বিতভাবে একটি কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে অনির্ধারিত আলোচনার সূত্রপাত হয়। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিষয়টি উত্থাপন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও এখনো তা করা হয়নি। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত বর্তমান সংসদ একটি বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। এই প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। তিনি জানান, বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সেই দায়িত্ব পালনের সুযোগ চান।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো স্বীকৃত কাঠামো নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে এ ধরনের পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের পরামর্শ দিতে পারেন না এবং রাষ্ট্রপতিও তা করতে পারেন না। তিনি জানান, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশটি আইন বা অধ্যাদেশ–কোনোটিই নয়; বরং একটি আরোপিত প্রশাসনিক আদেশের মতো। এই অবস্থায় সংবিধান পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, গণভোটের রায়কে সম্মান জানাতে হবে, তবে তা অবশ্যই সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ বিষয়ে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি।
ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস স্মরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি জামায়াতে ইসলামীকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে একই আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহিদদের স্মরণ করেন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন দ্রুত আহ্বান করার দাবি জানান।
অধিবেশনে সংসদের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনা ওঠে। পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সংসদ কক্ষে ব্যবহৃত সাউন্ড সিস্টেম ও হেডফোন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অস্বাভাবিক বড় আকারের হেডফোন ব্যবহারে সদস্যদের অসুবিধা হচ্ছে এবং এর পেছনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। এ সময় সংসদ সদস্যদের বক্তব্য প্রদানের ধরন নিয়েও সতর্ক করেন স্পিকার। তিনি বলেন, সংসদে দেখে দেখে বক্তব্য পাঠ করা রেওয়াজ নয়; নোট ব্যবহার করে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। তবে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেগুলো উত্থাপন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন নিতে হয়। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া অধ্যাদেশগুলো এখন সংসদের পর্যালোচনার আওতায় এসেছে।
অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে গঠিত ১৪ সদস্যের কমিটিকে আগামী ২ এপ্রিলের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
দিনের কার্যক্রম শেষে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা স্থগিত রেখে স্পিকার অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। তবে দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রশ্নে শুরু হওয়া বিতর্ক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনজুড়ে রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে শনিবার সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ৩টায় অধিবেশন বসবে। অধিবেশনের সময়সূচি ও কার্যদিবস-সংক্রান্ত যেকোনো প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের ক্ষমতা স্পিকারকে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সংসদে মোট ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।