জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনের ভাড়া সমন্বয় করা হলেও মাঠপর্যায়ে বিরাজ করছে চরম বিশৃঙ্খলা। সরকার প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১১ পয়সা বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও রাজধানীর লোকাল বাস থেকে শুরু করে আন্তজেলা রুটে যাত্রীপ্রতি আদায় করা হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে দেশে ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানো হয়। এরপর পরিবহন মালিকদের চাপের মুখে সরকার ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটার মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৫৩ পয়সা দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার আশপাশে এই হার ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ৪৩ টাকা করা হয়েছে। শতকরা হিসেবে নগর পরিবহনে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দূরপাল্লায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ ভাড়া বেড়েছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক রুটে যাত্রীপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যা শতাংশের হিসেবে ১৭ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত।
সাত বিভাগীয় শহরে যেতে ভাড়া বাড়ছে যেভাবে
জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণের পর নতুন প্রজ্ঞাপনে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের বাস ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে রাজধানী থেকে সাত বিভাগীয় শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে যাতায়াত খরচ এক লাফে বেশ খানিকটা বেড়েছে।
ঢাকা থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৪২ কিলোমিটার। সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রামগামী ৪০ সিটের বাসে আগে টোলসহ ভাড়া ছিল ৬৭০ টাকা, যা এখন ৩৪ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০৪ টাকায়। অন্যদিকে, সিলেটের দূরত্ব ২৫৭ কিলোমিটার হওয়ায় সায়েদাবাদ থেকে এই গন্তব্যের ভাড়া ৪০ টাকা বাড়িয়ে ৭৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজধানীর গাবতলী থেকে উত্তরাঞ্চলের প্রধান শহর রাজশাহীর দূরত্ব ২৪৭ কিলোমিটার। এই পথে আগের ৭০০ টাকার ভাড়া ৩৮ টাকা বেড়ে হয়েছে ৭৩৮ টাকা। একই টার্মিনাল থেকে রংপুরের দূরত্ব ৩০৮ কিলোমিটার হওয়ায় যাত্রীদের আগের চেয়ে ৪১ টাকা বেশি গুনতে হবে; অর্থাৎ নতুন ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৯১১ টাকা। এ ছাড়া গাবতলী থেকে বগুড়া যেতে ২৮ টাকা বাড়তি খরচ করে এখন দিতে হবে ৫৭৮ টাকা।
দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রী সাধারণের জন্য যাতায়াত ব্যয় বেড়েছে। সায়েদাবাদ থেকে খুলনার ২০৫ কিলোমিটার দূরত্বের পথে আগের ৬৫০ টাকার ভাড়া এখন ৩০ টাকা বেড়ে ৬৮০ টাকা হয়েছে। বরিশাল রুটে ১৭১ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া ২৬ টাকা বাড়িয়ে ৫৯১ টাকা করা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫৬৫ টাকা।
বিভাগীয় শহরের বাইরে পর্যটন নগরী কক্সবাজার যেতে সায়েদাবাদ থেকে এখন খরচ হবে ১ হাজার ১৪৭ টাকা, যা আগের তুলনায় ৫৭ টাকা বেশি। কুমিল্লার ভাড়া ১৬ টাকা বেড়ে ৩০৬ টাকা এবং মহাখালী থেকে ময়মনসিংহের ভাড়া ১৫ টাকা বেড়ে ৩৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ পথ দিনাজপুর থেকে টেকনাফের ৮৪৪ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া এক ধাক্কায় ১১৭ টাকা বেড়েছে। ফলে এই দীর্ঘ পথে যাতায়াতে যাত্রীদের এখন দিতে হবে ২ হাজার ৪৫৭ টাকা, যা আগে ছিল ২ হাজার ৩৪০ টাকা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, দূরপাল্লার বাসে ৪০ আসনের বিপরীতে এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কার্যকর হওয়া ভাড়া আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করতে মাঠে কাজ করবে প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
রাজধানীতেও ভাড়া বেড়েছে খেয়ালখুশিমতো
রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রুটে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুর থেকে ইসিবি চত্বর পর্যন্ত যে পথে ভাড়া সর্বোচ্চ ৪০ টাকা হওয়ার কথা, সেখানে আদায় করা হচ্ছে ৫০ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারে ভাড়া বেড়েছে ৬৪ পয়সা হারে। একই অবস্থা গাবতলী থেকে আবদুল্লাহপুর রুটেও, যেখানে ৬০ টাকার ভাড়া এখন ৭০ টাকা।
মালঞ্চ পরিবহনে মোহাম্মদপুর থেকে ধূপখোলা পর্যন্ত ৪২ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে ৩৭ টাকার পরিবর্তে ৪৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। পরিবহন কর্মীদের দাবি, ভাড়া নির্ধারণের নতুন চার্ট হাতে না পেলেও তেলের দাম বাড়ায় তারা নিজস্ব হিসাবেই বাড়তি টাকা নিচ্ছেন।
ঢাকার বাইরেও ভাড়া নিয়ে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বরিশাল-ঢাকা রুটে সরকারি প্রজ্ঞাপনের আগেই আসনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সাকুরা, হানিফ ও শ্যামলীর মতো পরিবহনগুলো ৫০০ টাকার ভাড়া ৬০০ টাকা আদায় করছে।
বরিশাল থেকে নথুল্লাবাদ টার্মিনালের পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, তেলের দাম বাড়ার পর মালিকের নির্দেশে তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনার অপেক্ষা করার প্রয়োজন বোধ করেননি।
লঞ্চের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই; প্রকারভেদে ১০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
পরিবহনসংকটের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। বর্তমানে রাজধানীর পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে প্রায় ২০ শতাংশ বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাস চালকরা জানিয়েছেন, পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে তারা নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছেন না। শাহবাগ, বাংলামোটর ও কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় বাসের সংখ্যা অনেক কমে যাওয়ায় প্রতিটি গাড়িতে যাত্রীদের গাদাগাদি করে উঠতে হচ্ছে। নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভোগান্তি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।