পবিত্র ঈদুল আজহার আগেই প্রথমবারের মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসগুলোর ভাড়া নির্ধারণ করতে চায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন রুটের এসি বাসের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়ার একটি খসড়া প্রস্তাব আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জমা দিতে পরিবহন মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আব্দুস সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভাড়া নিয়ে বিশৃঙ্খলা ও অভিযোগ
সভায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম জানান, ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী জেলায় এসি বাসে যাতায়াত করতে প্রতি কিলোমিটারে পাঁচ টাকা দিতে হচ্ছে। ওপরের এই ছয় জেলা ডিটিসিএর আওতাভুক্ত।
ভাড়ার ক্ষেত্রে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বেসরকারি বাস মালিকরা ডিটিসিএর এ সিদ্ধান্ত মানছেন না। তারা খেয়ালখুশিমতো ভাড়া আদায় করেন।
সভায় বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) ও এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণে গঠিত সাব-কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধরনের এসি বাস চলাচল করছে এবং একেক কোম্পানির খরচ একেক ধরনের। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় কোম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছে, যা নিয়ে যাত্রীদের পক্ষ থেকে প্রায়ই অভিযোগ আসে। বিশেষ করে ঈদের সময় এসি বাসের ভাড়া নিয়ে সরকারকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় ।’ এই সংকট নিরসনে একটি সর্বনিম্ন স্ট্যান্ডার্ড ধরে ভাড়া নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
এসি বাসের রক্ষণাবেক্ষণে ‘হিমশিম’ খাচ্ছেন বাস মালিকরা
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা খবরের কাগজকে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় চলাচল করা এসি বাসের ভাড়ার একটি তালিকা দিয়েছেন। সেই তালিকায় দেখা যাচ্ছে, ২৭-৪০ সিটের হুন্দাই, ম্যান, স্ক্যানিয়া, অশোক লিল্যান্ড, বিজনেস, আনকাই, হাইগার, আর-এম ২, ভলভো স্লিপার বাসগুলো চলাচল করছে বিভিন্ন রুটে।
২৭-৩৩ সিটের হুন্দাই, ম্যান, স্ক্যানিয়া, বিজনেস ক্লাসের বাসে ঢাকা থেকে খুলনা যেতে যাত্রীকে গুনতে হয় ১ হাজার ২০০ টাকা; বেনাপোল যেতে গুনতে হয় ১ হাজার ৪০০ টাকা; সিলেট ও রংপুর যেতে খরচ হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। ৩৬-৪০ সিটের ইকোনমি ক্লাসের বাসে ভাড়া দিতে হয় ৮৫০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা। অশোক লিল্যান্ড, আনকাই, হাইগার, আর-এম ২, ভলভো স্লিপার বাস ভাড়া রুট অনুযায়ী ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা রাখা হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, এসি বাসের রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তারা এ খাতে সরকারি প্রণোদনার আবেদন জানিয়েও সাড়া পাননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সারা দেশে ১২ ধরনের এসি বাস চলাচল করে, যার আসন সংখ্যা ২৮ থেকে ৪০ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এসব বাসের জ্বালানি, মবিল ও গ্যাসসহ পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। সব এসি বাস আবার টার্মিনালের রাখারও সুযোগ পাই না আমরা। যে টার্মিনালে যত বেশি সুযোগ-সুবিধা আছে সেখানেই বেশি যাত্রী পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ এসি বাস টার্মিনালের বাইরে সড়কে রাখতে হয়। এতে পার্টস চুরির শঙ্কা তো থাকেই। এসি বাসের ভাড়া বাড়াতে গেলে এসব দিক বিবেচনা করতে হবে।’
ভাড়া নির্ধারণেও আপত্তি পরিবহন নেতাদের
এসি বাসে যেমন খুশি তেমন ভাড়া আদায় বন্ধ করতে সরকার কঠোর নির্দেশনা জারি করলেও তা নিয়ে বেজায় আপত্তি জানান পরিবহন মালিকদের একাংশ।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, আমাদের দেশে আরবান ট্রান্সপোর্টের দুর্দশার কারণ হলো, সরকার থেকে কোনো আর্থিক সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া ও ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া। অনেক ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে এ সেক্টর থেকে বিদায় নিয়েছেন। এ খাতে যে পরিমাণ আয় সে তুলনায় খরচের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।’
এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ এই পরিবহন মালিক বলেন, ‘সরকার এসি বাসের ভাড়ার দিকে নজর দিচ্ছে কিন্তু বিমান ভাড়ার বিষয়ে কেন হাত দিচ্ছে না! একই দিনে বা সপ্তাহে বিমানের ভাড়া ওঠানামা করে। সেদিকে সরকারের খেয়াল রাখা উচিত।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘বাসের পার্টস পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের হার যখন বাড়ে, তখন সেসব পার্টস আমাদের বহুগুণ দাম দিয়ে কিনতে হয়। লুব্রিকেন্টের দামও বেড়েছে। কিন্তু সে হারে এসি বাসের ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি। পক্ষান্তরে তেলের দাম কমলে যাত্রীদের থেকে ভাড়া কম নেওয়া হয়। সরকার যদি পার্টস, লুব্রিকেন্টের বাজারদর বিবেচনা না করে ভাড়া বাড়াতে চায়, তাহলে বাস মালিকদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব না। বাস মালিক সমিতি ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তবেই এসি বাসের ভাড়া চূড়ান্ত করতে হবে।’
বহরের ১০২টি এসি বাস নষ্ট, তাও ভাড়া বাড়াতে চায় বিআরটিসি
বিআরটিসির বহরে থাকা ৩৩০টি এসি বাসের মধ্যে ১০২টি (প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) বর্তমানে বিকল হয়ে পড়ে আছে। বিশেষ করে অশোক লিল্যান্ড মডেলের বাসগুলোর অবস্থা এতটাই নাজুক যে, বৃষ্টির সময় ছাদ দিয়ে ভেতরে পানি পড়ে। আগামী জুনের মধ্যে এসব বাস মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটেও এসি বাসের ভাড়া বাড়াতে চায় বিআরটিসি। বিআরটিসির ডিজিএম (অপারেশন) শুকদেব ঢালী এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাব দেন। তিনি বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় বিআরটিসির এসি বাসের ধরন অনুযায়ী ক্যাটাগরিভিত্তিক নতুন ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানান।
আন্তঃজেলা এসি বাসকে লাক্সারি সার্ভিস হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব
ডিটিসিএ কর্মকর্তা ধ্রুব আলম বলেন, ‘আরবান ট্রান্সপোর্টের মতো আন্তঃজেলা এসি বাসকে সাধারণ গণপরিবহন হিসেবে গণ্য না করে, একে লাক্সারি সার্ভিস বা বিলাসজাত সেবা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই সার্ভিসগুলোকে স্পেশাল সার্ভিস ধরে সে অনুযায়ী নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা যৌক্তিক।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে আন্তঃজেলা এসি বাসের সেবার মান এবং ভাড়া কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।