রবিবার (৩ মে) থেকে শুরু হচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬। চার দিনব্যাপী এ সম্মেলন চলবে ৬ মে পর্যন্ত। এবারের সম্মেলন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় একদিন বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা নীতি-নির্ধারণ ও মাঠ প্রশাসনের কার্যক্রমে আরও গভীর আলোচনা ও সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শনিবার (২ মে) সচিবালয়ে ‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. হুমায়ুন কবির এ তথ্য জানান।
এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের উদ্বোধন হবে ৩ মে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সম্মেলনে দেশের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা সরকারের নীতি, উন্নয়ন কর্মসূচি এবং মাঠ প্রশাসনের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি দিকনির্দেশনা গ্রহণ করবেন।
মূলত মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৯৮টি প্রস্তাব এবারের কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব প্রস্তাবে জনসেবা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, জনদুর্ভোগ হ্রাস, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, পর্যটন খাতের বিকাশ, আইন ও বিধিমালা সংশোধন এবং জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় অগ্রাধিকার পেয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ-সংক্রান্ত প্রস্তাবের সংখ্যা সর্বোচ্চ, যা ৪৪টি।
সম্মেলনে মোট ৩৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে ৩০টি কার্য-অধিবেশন। এতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ কমিশন নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন অংশ নেবে। পাশাপাশি ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সিনিয়র সচিব ও সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার প্রধানরা অংশগ্রহণ করবেন।
সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উচ্চপর্যায়ের সাংবিধানিক পদাধিকারীদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকদের মতবিনিময়। ৩ মে সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে। পরদিন ৪ মে জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের সঙ্গে এবং ৫ মে সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে জেলা প্রশাসকরা মতবিনিময় করবেন। এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গেও পৃথক কার্য-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
এবারের সম্মেলনে ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যক্রম জোরদার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুরুত্ব পাবে।
সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকদের মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিদ্যমান আইনগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জগুলো সরাসরি নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা হবে। এতে করে এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর কৌশল নির্ধারণ এবং জেলার সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর পথ সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সম্পর্কে মাঠ প্রশাসন একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করবে।
গত বছরের সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫ সালের সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হার ৬১.৭৪ শতাংশ, মধ্যমেয়াদে ৩৫.৭৫ শতাংশ এবং দীর্ঘমেয়াদে ১৬.৬৭ শতাংশ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে, সম্মেলনে আলোচনার জন্য প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা খাতে জনবল নিয়োগ, শিল্পায়ন, কৃষি ও মৎস্য খাতের উন্নয়ন, ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটন উন্নয়ন এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের মতো বহুমাত্রিক উদ্যোগ। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
সামগ্রিকভাবে, জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬ মাঠ প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন দিকনির্দেশনা আসবে বলে জানান অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির।
তপন/রিফাত/