‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজ, পারস্য উপসাগরে আটকে থাকার সময়ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ ১১৫ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর অবশেষে হরমুজ প্রণালী সফলভাবে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কার্গো জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আটকে থাকা জয়যাত্রা জাহাজটি হরমুজ প্রণালী পার হয়েছে। সেটি এখন দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার পথে রয়েছে। দীর্ঘদিন হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে না পারা বিশ্ব মেরিটাইম ইতিহাসে এটিকে একটি অনন্য ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে নির্মিত ও ৩৮ হাজার ৮৯৪ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজটিতে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু রয়েছেন, যারা বর্তমানে নিরাপদ ও সুস্থ আছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের জলসীমায় জাহাজটি বাঙ্কারিং ও প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করেছে।
গত ২৬ জানুয়ারি একটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক চার্টারের অধীনে জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে কাতার থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে আসে। কিন্তু জাহাজটি বন্দরে অবস্থানকালেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই অঞ্চলে তীব্র সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। চরম ঝুঁকির মধ্যেই ১১ মার্চ সাহসিকতার সঙ্গে কার্গো খালাস সম্পন্ন করা হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালী পার হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ক্ষতি এড়াতে অলস বসিয়ে না রেখে বিএসসি ম্যানেজমেন্ট দ্রুত একটি বিকল্প বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নেয়।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী জাহাজটিকে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দরে পাঠিয়ে সেখান থেকে প্রায় ৩৭ হাজার মেট্রিক টন সার বোঝাই করা হয়, যা দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দরে যাওয়ার কথা। এই দক্ষ ব্যবস্থাপনার ফলে জাহাজটি এক দিনের জন্যও ‘অফ-হায়ার’ বা ভাড়া ছাড়া থাকেনি।
সার বোঝাই করার পর হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটির অবরুদ্ধ অবস্থা আরও দীর্ঘ হয় পড়ে থাকতে হয়। গত ১৮ এপ্রিল ইরান নৌবাহিনী নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজটির যাতায়াতের অনুমতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই স্পর্শকাতর যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ দিন অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকা পড়ে থাকে জাহাজটি।
দীর্ঘ অবরুদ্ধ সময়ে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিকের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বিএসসি জাহাজে সুপেয় পানি, খাবার, রসদ ও জ্বালানি তেলের মতো প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখে। পাশাপাশি স্বাভাবিক সুবিধার অতিরিক্ত হিসেবে দৈনিক ৫ মার্কিন ডলার বিশেষ মিল অ্যালাউন্স, ঈদে বিশেষ প্রণোদনা এবং ‘ওয়ার ওয়েজ’ দেওয়া হয়।
এমভি বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ১১৫ দিন পর অবশেষে আমরা মুক্ত হয়েছি। এ দীর্ঘ সময় যুদ্ধাবস্থার মধ্যে বড় আতঙ্কে ছিলাম। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ও মিসাইল গেছে। মনে হয়েছিল মুহুর্তে শেষ হয়ে যাব। আল্লাহ উপর ভরসা করে প্রতিটি রাত কাটিয়েছি। ঘুমানোর সময় মনে হতো আজই বুঝি জীবনেন শেষ রাত।
আবদুস সাত্তার/আজহার/