জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত ও সম্পূরক বাজেট উত্থাপিত হয়েছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং অপচয় রোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে সোমবার সংসদ অধিবেশনে এই বাজেট পেশ করেন বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মন্ত্রী জানান, সম্পূরক বাজেটে দুই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি, ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে অতিরিক্ত ৫৬ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ২০ জন এমপির পক্ষ থেকে ৩০৪টি ছাঁটাই প্রস্তাব করা হয়েছে। একই দিনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জেলা প্রশাসক নিয়োগ, দিল্লির বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাকে আটকে রাখা, নারী-শিশু সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সড়ক ও রেল নিরাপত্তা নিয়ে সংসদে ব্যাপক আলোচনা হয়।
সোমবার (১৫ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সপ্তম দিনে সম্পূরক বাজেটের সামগ্রিক তথ্য উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা, অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপচয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন এবং প্রশাসনিক মিতব্যয়িতা নিশ্চিতের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারের নিট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। তবে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের গতি মন্থর হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
সম্পূরক বাজেটে ২৭টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৫৯ হাজার ৩৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থ বিভাগে সর্বোচ্চ ২৩ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা, পরিকল্পনা বিভাগে ১২ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে প্রায় ১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্পিকার জানান, সম্পূরক বাজেটে মোট ২৫টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দলের ২০ জন সদস্য মোট ৩০৪টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিশ দিয়েছেন। অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ আটটি মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার কীভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে এবং তাতে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে কি না–এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চান। তার প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যথাসময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এ বিষয়ে সরকার ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।
এ সময় জেলা প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন রুমিন ফারহানা। তিনি অভিযোগ করেন, নতুন নিয়োগ পাওয়া জেলা প্রশাসকদের অনেকেই দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত এবং নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধির পরিবর্তে ডিসিদের মাধ্যমে জেলা প্রশাসন পরিচালনা সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আটকে রাখার ঘটনায় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান এ ঘটনায় ৩০০ বিধিতে সরকারের ব্যাখ্যা দাবি করেন এবং একে কূটনৈতিকভাবে উদ্বেগজনক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
সংসদে নারী ও শিশু সুরক্ষা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থাপিত জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব এবং সাতটি বিভাগীয় ল্যাবের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৪১ হাজার ৫৫৫টি নমুনার ডিএনএ প্রোফাইলিং সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ১৪টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও ৯৫টি সাপোর্ট সেন্টারের মাধ্যমে প্রায় আড়াই লাখ নারী ও শিশুকে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিয়ের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল জন্মসনদ বাধ্যতামূলক করতে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭’ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাল জন্মসনদের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে সংসদে রেলপথ ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়। রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ের পুরোনো ও অকেজো রেললাইন নিলামে বিক্রি করা হয় না। এগুলো রেলওয়ের বাঁধ সুরক্ষা, অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে বেড়া নির্মাণ এবং নিরাপত্তামূলক কাজে পুনর্ব্যবহার করা হয়।
মন্ত্রী আরও জানান, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সংস্কার, সাইন-সিগন্যাল স্থাপন, স্পিডব্রেকার নির্মাণ এবং চালকদের বাধ্যতামূলক রিফ্রেশার প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া সংসদে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে বিআরটিএ নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। অবৈধ মোটরসাইকেলগুলো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলের মাধ্যমে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।