ইশতেহার যত আকর্ষণীয়ই হোক, যদি নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা কাটানো না যায়, তাহলে সে ইশতেহারের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকবে না। জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, যেখানে ভোটাধিকার সত্যিকার অর্থেই কার্যকর হবে।...
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার সামনে এসেছে। কেউ রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছে, কেউ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশ্বাস দিচ্ছে, কেউবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কাগজে-কলমে এসব ইশতেহার পড়লে মনে হয়, দেশ যেন খুব শিগগিরই এক আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে- এ ইশতেহারগুলো কি সত্যিই বাস্তবায়নের পথে যাবে, নাকি নির্বাচনের পর ফাইলবন্দি হয়ে পড়বে? কারণ কাগজে-কলমে অনেক ভালো ভালো কথা সবসময়ই সবাই বলার চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা সে বিষয়ে অনেক ব্যত্যয় পরিস্থিতির উদাহরণ দিতে পারব।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইশতেহার ও বাস্তবতার মধ্যে যে গভীর ফাঁক রয়েছে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর অধিকাংশ দলই ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ভুলে যায় অথবা বাস্তবতার অজুহাতে সেগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। ফলে জনগণের কাছে ইশতেহার অনেক সময়ই ‘নির্বাচনি ভাষণ’ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
এবারের নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে একটি মিলিত সুর লক্ষ করা যায়- তাহলো রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিশেষ করে বিএনপি তাদের ইশতেহারে শাসনব্যবস্থার সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের পেশাদারিত্ব এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, নৈতিক শাসন এবং ‘ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র’ গঠনের কথা বলছে। নতুন বা ছোট দলগুলো আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে র্যাব বিলুপ্তি, গোয়েন্দা সংস্থার পুনর্গঠন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মতো সাহসী প্রস্তাব দিচ্ছে।
কাগজে এসব প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে যেসব সমস্যা নিয়ে নাগরিক সমাজ কথা বলে আসছে- দুর্নীতি, বিচারহীনতা, প্রশাসনের দলীয়করণ- সেগুলো ইশতেহারে জায়গা পাওয়াটা ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সামাজিক ঐকমত্য কি আদৌ আছে? একটি নির্বাচন কেবল ভোট গ্রহণের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনের আগে মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা, বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ এবং সমান প্রচারের পরিবেশ- এসবই একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্ব শর্ত। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা ও অভিযোগ রয়েছে। কোথাও সভা করতে বাধা, কোথাও নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘অতি উৎসাহ’- এসব বিষয় নির্বাচনি শঙ্কাকে আরও গভীর করছে।
এবারের নির্বাচনি আলোচনায় সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অভিযোগ করছে যে, অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষতার জায়গা থেকে সরে গিয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, বাস্তবতা হলো, জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এ আস্থার সংকট দূর না হলে কোনো ইশতেহারই বাস্তবে কার্যকর হবে না। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। ভোটার বিশ্বাস করবে তার ভোটের মূল্য আছে, রাজনৈতিক দল বিশ্বাস করবে তারা সমান সুযোগ পাবে, আর রাষ্ট্রযন্ত্র বিশ্বাস করবে সে জনগণের সেবা করছে, কোনো দলের নয়। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, এবারের ইশতেহারগুলো কি সত্যিই আলাদা কিছু, নাকি পুরোনো ধারারই পুনরাবৃত্তি? রাষ্ট্র সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা- এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে ক্ষমতায় গিয়েই প্রথম ধাক্কাটা নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো সেই সাহস দেখাতে পারবে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন।
ইশতেহার যত আকর্ষণীয়ই হোক, যদি নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা কাটানো না যায়, তাহলে সে ইশতেহারের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকবে না। জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, যেখানে ভোটাধিকার সত্যিকার অর্থেই কার্যকর হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তারা চাইলে প্রমাণ করতে পারে যে রাষ্ট্রযন্ত্র দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, আইন সবার জন্য সমান হতে পারে এবং ভোটার নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে। এটি করতে হলে প্রশাসনকে কেবল নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মানলেই চলবে না; নিজেদের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও ভাষার মধ্যদিয়েও নিরপেক্ষতার বার্তা দিতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
.jpg)
