আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, উচ্চাভিলাষী বাজেট রাজনৈতিক সরকারগুলোর জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, উচ্চমূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উচ্চাভিলাষী বাজেট খুব কমই দেখা গেছে।

এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করা এবং প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা। অর্থনীতিকে গতিশীল করার এ প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। মূল প্রশ্ন হলো–এই বিপুল ব্যয়ের অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংগ্রহ করতে হবে ৬ লাখ কোটিরও বেশি। বাস্তবতা হলো, গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় প্রায় প্রতি অর্থবছরেই রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থেকেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে মন্থরতা এবং কর প্রশাসনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এ লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে হয়।
রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে বাজেট ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পাবে। তখন সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণ, বৈদেশিক ঋণ অথবা অন্যান্য অর্থায়নের উৎসের ওপর অধিক নির্ভর করতে হবে। বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়।
বাজেটে বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কঠোর শর্ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ ছাড়ের জটিলতার কারণে এ অর্থ প্রত্যাশিত মাত্রায় ও নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতাও সে আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নে ঘাটতি দেখা দিলে তার চাপ সরাসরি দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের ওপর এসে পড়বে।
এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্যসংকট এবং কিছু ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থাহীনতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় সরকার যদি অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়ন আরও সংকুচিত হবে। এর ফলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো মূল্যস্ফীতি। রাজস্ব ও ঋণের মাধ্যমে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের পথ বেছে নেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ইতোমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর।
এবারের বাজেটের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনতে পারে। এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
আমার বিবেচনায় বাজেট বাস্তবায়নের পথে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো–উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা সংগ্রহে সম্ভাব্য ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও তারল্যসংকট, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব, উচ্চমূল্যস্ফীতি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি।
আমাদের প্রতিবেশী ভারতও নিয়মিতভাবে বড় আকারের ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে। দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা, পুঁজিবাজার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক গভীর ও শক্তিশালী। ফলে তারা সহজেই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই একই ধরনের ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়ন আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কঠিন।
বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। এবারের বাজেট উচ্চাভিলাষী, প্রবৃদ্ধিমুখী এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজস্বব্যবস্থা, দক্ষ প্রশাসন, সুস্থ ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বাস্তবভিত্তিক অর্থায়ন পরিকল্পনা।
আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়, এই বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। প্রয়োজনীয় সংস্কার, সুশাসন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: সভাপতি, জাতীয় পার্টি, মাদারীপুর জেলা শাখা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা


