ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে না, ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করছে, অথচ কর দিচ্ছে না, কোম্পানির ডিভিডেন্ট দেয় না, অথচ ওই কোম্পানির এমডি পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের জরিমানাসহ করের আওতায় আনতে হবে। সরকারের আয়-ব্যয়ের সমন্বয়হীন অসম আকার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংস্কার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।...

আগামী বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। এনবিআরের রাজস্বের আওতা ও লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করতে হবে। এতে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। সেবা খাতের খরচ বাড়বে। যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। এখনই সাধারণ মানুষ খরচের চাপে আছে। আরও খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে।
রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থসংকটে নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগামী বাজেটে খরচ কমানোর প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবায়ন হবে না। বরং বাজেটে সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অনেক জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্প খাতে খরচ বাড়বে। এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু এই দুই কারণেই অনেক কিছুর দাম ও খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এ সবকিছুই জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ফেলবে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক-কর-ভ্যাটের কারণে বিভিন্ন নিত্যপণের দাম বাড়বে। চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ বাড়বে। শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়বে। আমদানি করা পণ্যের দামও বাড়বে। দেশি পোশাকের দাম বাড়বে। ঠিকাদার ব্যবসায়ের লাইসেন্স ফি বাড়বে। বাজেটে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্য তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর কিছুটা কমিয়ে বহাল থাকছে। আমদানিকারকরা এই বহাল থাকা করের অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখার সুযোগ পেতে পারেন। এমনও জানা যাচ্ছে যে, আগামী বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোয় দেশে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়বে। এমনকি আমদানি করা গুঁড়া দুধ, মাছ ও শুকনা ফলের দাম বাড়বে।
মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান রাজস্ব বহাল থাকলেও উচ্চ সিসির সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক হার বাড়বে। এতে আমদানি করা বেশি সিসির মোটরসাইকেলের দাম বাড়বে। অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে আমদানিকৃত প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। পার্লারের খরচ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে চলাচল খরচও আসন্ন বাজেটে বেশি থাকবে। আগামী বাজেটে দেশে শিল্প খাতে ব্যবহৃত অনেক কাঁচামালের আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। বিশেষভাবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, লোহার রড, স্ক্র্যাব, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হবে। দেশি গরুর দুধ, মসলা ও দেশি শিল্পে বানানো খেলনার দাম বাড়বে না।
আবার, দেশে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, তারল্যসংকট, দেউলিয়া বা অস্তিত্বের জন্য হুমকি, এমন সব ঝুঁকির সময়োপযোগী সমাধান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে ইতোমধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিগত সময়ে আর্থিক খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। নজিরবিহীন অপশাসনের মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে প্রায় ধ্বংসের মধ্যে ফেলে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। ব্যাংকগুলো লুটপাটের কারণেই আর্থিক খাতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের পুঁজিবাজারেও। দেশ থেকে প্রচুর টাকা পাচার হয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র এখন সামনে আসতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ ব্যাংকগুলোকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে মাফিয়া গ্রুপ। এ সরকারের সময় আর সেই সুযোগ নেই। এদের বিচারের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে সংস্কারের দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করে ভালো কিছু আশা করা যায় না। আমাদের রাজস্ব বাজেটের আকার বেড়েছে, যা এডিপির তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ। রাজস্ব নিয়ে আমাদের আগে থেকেই আরও চিন্তাভাবনা করা উচিত ছিল। আগের সরকার নির্বাচনের নামে নানারকম প্রহসন করেছে। ফলে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কাজেই গণতন্ত্রের নামে আমরা এখনো যদি বিভাজন করি, তাহলে কোনোভাবেই সামনে এগোনো সম্ভব নয়। দেশে বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলেই ব্যবসা ও বিনিয়োগ সৃষ্টিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন। কৃষকের জন্য কোনো কিছুর ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ খুবই ভালো দিক।
শেয়ারবাজারকে পুনরায় চাঙা করে তুলতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির মধ্যকার করপোরেট করহারের ব্যবধান বৃদ্ধি এবং ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেনের ওপর ধার্য কর কমানো। এসব প্রণোদনার সুবিধাভোগী শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিনিয়োগকারীরা কোনো সুবিধা পাবেন না। যদিও বাজেটের আগে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয় থেকে শুরু করে মূলধন মুনাফার ওপর থেকে কর প্রত্যাহারে জন্য দাবি জানানো হয়েছিল। আমরা যে বাজেট প্রণয়ন করি, তার ৭০ শতাংশই রাজস্ব বাজেট। এর কারণ হলো, আমাদের অর্থনীতির তুলনায় বিশাল আকারের সরকার নিয়ে আমরা বসে আছি। এখন এ বিশাল আকারের সরকারকে চালাতে হলে জনগণকে কর দিতে হবে। সরকার দক্ষ না হলে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে না। বড় অর্থনীতির দেশ অথচ সরকারের পরিধি অনেক ছোট, এমন অনেক দেশ আছে। তারা পারছে, কাজেই আমাদেরও সেটা পারতে হবে। বাজারে কোনো কোম্পানি যখন লাভ করতে পারছে না, সেটাকে ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখার কোনো দরকার নেই। একটা লোকসানি শিল্পকে কেন সরকারের মধ্যে রাখতে হবে?
কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমরা বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। যতদিন এ ভর্তুকির সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারব, ততদিন আমাদের অর্থনৈতিক দৈন্য থেকেই যাবে। আর এসব কারণেই আমরা কর সংগ্রহ যতটুকুই করি, খরচটা অপব্যয় হচ্ছে এবং সেটা রোধ করতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে যে ক্ষেত্রগুলো করহারের অধীনে আসেনি সেগুলোকে করহারের আওতায় আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে অটোমেশনে যেতে হবে। যাদের ঢাকা শহরে অনেক বাড়ি আছে, অথচ তারা সরকারকে কর ফাঁকি দিচ্ছে। এ রকম উদাহরণ বহু আছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে না, ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করছে, অথচ কর দিচ্ছে না, কোম্পানির ডিভিডেন্ট দেয় না, অথচ ওই কোম্পানির এমডি পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের জরিমানাসহ করের আওতায় আনতে হবে। সরকারের আয়-ব্যয়ের সমন্বয়হীন অসম আকার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংস্কার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, আইসিবি


