ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ-ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিপুল বিজয়ের পর রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। নেতাদের কেউ কেউ এই জয়কে দেখছেন ইতিবাচক হিসেবে। তাদের ভাষ্যে, তরুণরা চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব দেখতে চায় না বলেই ডাকসুতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল জয় পেয়েছে। তবে ডাকসু নির্বাচনের এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে ‘বড় প্রভাব ফেলবে না’ বলে মনে করেন তারা।
গতকাল বুধবার খবরের কাগজের সঙ্গে আলাপচারিতায় তারা বলেছেন, সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তরুণদের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন এসেছে। সেই বিবেচনায় নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণের বার্তা দিয়েছে ডাকসু নির্বাচন। তারা বলেছেন, প্রগতিশীল রাজনীতির চলিত ভাষ্যে তরুণদের সমর্থন পাওয়া যাবে না। নিচে নেতাদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো।
ঢাবির ঐতিহ্য ম্লান হলো: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
ডাকসুর সাবেক ভিপি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী সব অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনের নাম জড়িত। সেই ছাত্র সংগঠনটি ডাকসু নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। এ ঘটনায় সাময়িকভাবে হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালি ঐতিহ্য ম্লান হলো।
ছাত্রসমাজ নতুন কিছু দেখিয়েছে: মাহমুদুর রহমান মান্না
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, তরুণরা চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব দেখতে চান না বলেই ডাকসুতে ইসলামী ছাত্রশিবির বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। তিনি বলেছেন, অপমানিত ছাত্রসমাজ নতুন কিছু করে দেখিয়েছে।
গতকাল সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে গণতন্ত্র মঞ্চ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ: সংস্কার বাস্তবায়নের পথরেখা’ শিরোনামে এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আচ্ছা মিলিয়ে দেখেন, এই গেস্টরুম কালচার, বড় ভাইদের সালাম করা, প্রটোকল দেওয়া, পরীক্ষা দিতে না দেওয়া- সব দেখে অপমানিত ছাত্রসমাজ। তারা মনে করেছেন, আমরা সাহস দেখাব। এই প্রজন্ম অভ্যুত্থানের এক বছর পরে মনে করছে, এই দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি তারা দেখতে চান না। তারা এখন নতুন কিছু করতে চান। ডাকসু নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন মান্না।
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধানও বলেন, বিগত ১৫ বছরে ছাত্রলীগের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীরা ডাকসু নির্বাচনে তাদের রায় দিয়েছেন। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের হামলায় ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না, দেশের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই কোথাও কাউকে দাঁড়াতে দেয়নি ছাত্রলীগ। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এসব ভালোভাবে নেননি। তারই প্রতিফলন ঘটেছে ডাকসু নির্বাচনে।
শিবির যেভাবে এগিয়ে, বামেরা কেন পিছিয়ে
ডাকসু নির্বাচনে মোট ২৮টি পদের ২৩টিতেই জিতেছে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল। সহসভাপতি (ভিপি) পদে বামপন্থি সাতটি ছাত্রসংগঠনের যৌথ প্যানেল প্রতিরোধ পর্ষদের প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি পেয়েছেন মাত্র ৬৮ ভোট। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৪ হাজার ৯৪৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন প্রতিরোধ পর্ষদের প্রার্থী মেঘমল্লার বসু।
ভোটের ফলাফলে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের পাশাপাশি ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত ১৫ বছরে ছাত্রলীগের দখলদারত্ব, গণরুম সংস্কৃতির কারণে ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক রাজনীতি পরিচালনা করতে পারেনি। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্রদল চাঁদাবাজি-দখলদারত্বের রাজনীতি শুরু করে। ক্যাম্পাসে সুসংগঠিত রাজনীতি তারা করতে পারেননি। উল্টো বিভিন্ন ক্যাম্পাসে মব ভায়োলেন্স করেছেন। শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগের রেপ্লিকা দেখতে চাননি।
তিনি বলেন, অন্যদিকে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে ঝটিকা মিছিল, সমাবেশ আর প্রেস কনফারেন্স ছাড়া বড় কিছু করতে পারেনি। তাদের মধ্যেও অনেক বিভক্তি ছিল। অন্যদিকে শিবিরের ছেলেরা গত ১৫-১৬ বছরে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থেকে নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করেছে। তারা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পাশে থেকেছেন। মানবিক সহায়তা ছাড়াও বিভিন্ন উৎসব ও আনন্দ আয়োজনে ক্যাম্পাসে শিবিরের কর্মীরা রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে সরব ছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে। এসব ঘটনারই প্রতিফলন ঘটেছে ভোটে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। নতুন প্রজন্মের ছাত্রদের সঙ্গে পুরোনো ছাত্র সংগঠনগুলোর জীবন্ত যোগাযোগের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি এটাও বলব যে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের পরে যে দক্ষিণপন্থি রাজনীতির উদ্ভব হয়েছে তাতে এই অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিয়েছে। গত ১৬ বছর ধরে সেই রাজনীতির ধারক-বাহকরা যে মেটিকুলাস ডিজাইন করেছে তারই আউটকাম ডাকসু ইলেকশন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ প্রায় একই ধরনের অভিযোগ এনেছেন। তাদের মতে, ৮টি ডাকসু নির্বাচনের মধ্যে এবারের নির্বাচন সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হল, রোকেয়া হল থেকে সিল মারা ব্যালট উদ্ধার, ব্যালট পেপার নিরীক্ষায় ওএমআর মেশিনের কারিগরি ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন প্রিন্স ও ফিরোজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর শেহরিন আমিন মনামীর ‘কল রেকর্ড বিতর্কের’ প্রসঙ্গ টেনে এনে ডাকসু নির্বাচনে প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বকেও বড় করে দেখছেন তারা। এই দুই বাম নেতার অভিযোগ, শিবিরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘প্রায় ১৫ কোটি টাকা’ বিতরণ করা হয়েছে।
ডাকসু নির্বাচনে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো প্রত্যাশিত ভোট পায়নি। বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভক্তি তো রয়েছেই, পাশাপাশি ক্যাম্পাসেও প্রত্যাশিত রাজনীতি তারা করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন বাম নেতারা। তারা বলেন, ডাকসু নির্বাচনে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর প্যানেলও পূর্ণাঙ্গ ছিল না। বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি দূর করা যায়নি। এতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা বামপন্থি কোনো প্যানেলকে আস্থাভাজন মনে করেননি। বামপন্থিদের প্রতি তরুণ ভোটারদের এমন মনোভাব জাতীয় নির্বাচনে ‘বড় প্রভাব’ ফেলতে পারে বলে মনে করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেন, ‘সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদে বিশ্বাসী সব শক্তিকে এখন সচেতন হতে হবে। তাদের এখন বড় ভূমিকা রাখতে হবে। আমি বলছি না এখনই কোনো একতাবদ্ধ ফোরাম হয়ে যাবে। আপাতত বামপন্থি দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কাজটা শুরু করা যেতে পারে।’
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল, বাম দল, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত ভোট পাননি। ডাকসু নির্বাচনকে অবশ্যই আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। ডাকসু নির্বাচন নতুন পথযাত্রা নির্দেশ করেছে।’
সাইফুল হক বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা-এসব পুরোনো ভাষায় ছাত্রদের আর উজ্জ্বীবিত করা যাবে না। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আমাদের এখন তাদের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের চিন্তাধারাকে মূল্যায়ন করতে হবে। রাজনীতিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সে দিক বিবেচনায় ডাকসু নির্বাচন আমাদের জন্য ওয়েক-আপ কল।’