পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-৪ আসন। স্বাধীনতার পর এই আসনে আওয়ামী লীগ ছয়বার জয় পায়। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী চারবার ও বিএনপির প্রার্থী এখান থেকে একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ভোটের ফলের হিসাবে আসনটিকে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর রংপুরের এই আসনটিকে ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ধরে নেওয়া হচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে পারবে না। এ ছাড়া জাতীয় পার্টিও রয়েছে নীরব। এমন বাস্তবতায় ৪৬ বছর আগে এখান থেকে জয় পাওয়া বিএনপি আবারও আসনটি নিজেদের দখলে নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের প্রার্থীও প্রচারের মাধ্যমে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। অন্যদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া একজন নেতা এই আসনে এনসিপির প্রার্থী হয়েছেন। এই তিন দলই রংপুর-৪ আসন নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিল্পপতি রহিম উদ্দিন ভরসা মুসলিম লীগের রাজনীতি করতেন। ১৯৭৮ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালের তিনি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে এই আসনে নির্বাচন করে জয়ী হন। তার ছোট ভাই করিম উদ্দিন ভরসা জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে একই আসনে পরে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। দুই ভাই মিলে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। রহিম উদ্দিন ভরসার ছেলে শিল্পপতি এমদাদুল হক ভরসা এবার বিএনপির হয়ে ৪৬ বছর আগে হারানো আসনটি পুনরুদ্ধারে মাঠে নেমেছেন। নিয়মিত নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। কাউনিয়া উপজেলার বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির সদস্য এমদাদুল হক ভরসা একসময় উপজেলার ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। ২০১৪ সালে শ্রেষ্ঠ করদাতা হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পান।
এমদাদুল হক বলেন, ‘বিভিন্ন স্কুল কলেজ মসজিদ মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছি। প্রতি শীতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কম্বল বিতরণ করেছি। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করছি। আমার বাবা-চাচা যেভাবে কাজ করে গেছেন সেভাবে মানুষের সেবা করতে চাই। তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই। এলাকায় শিল্প কারখানা স্থাপন, বেকারদের কর্মসংস্থান, নারীদের স্বাবলম্বী করার প্রয়াস আমার আছে।’
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমদাদুল হক ভরসার কিছু বক্তব্যে নেতা-কর্মীরা বিব্রত হয়েছে। কিছুদিন আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে তিনি চেনেন না বলে মন্তব্য করেন। এরপরই তাকে নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আর এই সুযোগকে কাজে লাগাতে জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থী মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ৪ জুলাই রংপুর জেলা স্কুল মাঠে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। তারপর থেকেই দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা এ টি এম আজম খান মাঠে নেমে পড়েন। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে থাকেন। জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরাও তার পক্ষে জনসমর্থন গড়তে প্রচার করতে থাকেন। তবে পুরো আসনে তখনও নির্বাচনি আমেজ তৈরি হয়নি। ৩ নভেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে দেশের ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। মূলত এরপর থেকেই রংপুর-৪ আসনে নির্বাচনি আমেজ দেখা যায়। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মিছিল-মিটিং ও গণসংযোগে পুরো এলাকায় ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করে।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ টি এম আজম খান দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসের শুরা সদস্য। এ ছাড়া তিনি রংপুর মহানগর আমিরের দায়িত্বে রয়েছেন। স্থানীয় মেরুরা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ তিনি। তিনি বলেন, ‘পীরগাছা-কাউনিয়া এলাকার যেসব জায়গায় এখনো রাস্তা হয়নি, এমপি হতে পারলে সেসব জায়গায় আগে রাস্তা বানানো হবে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়নি সেগুলো নিয়ে কাজ করা হবে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে তিস্তাবিধৌত এলাকার মানুষের দুঃখ লাঘবে পরিকল্পনা করে সেগুলো বাস্তবায়ন করব। রাজনীতি করে যে যোগ্যতা অর্জন করেছি কাউনিয়া-পীরগাছার জনগণের জন্য তা ওয়াকফ্ করতে চাই।’
এদিকে রাজনৈতিক নানা সমীকরণের মধ্যে এই আসনের তরুণ ভোটারেদের এনসিপির প্রার্থী দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের দিকে ঝুকতে দেখা যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৪৭ হাজার বেড়েছে। তাদের একটি বড় সংখ্যাই এনপিসির প্রার্থীর পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের গিয়ে ভোটার প্রচার চালানোর সময় তিনি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন।
কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর গ্রামের বাসিন্দা আখতার হোসেন। তিনি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০১৮ সালে প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে একা অনশন করেন আখতার। ওই অনশনের মাধ্যমেই তিনি জাতীয়ভাবে পরিচিত পান। তবে চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম এই নেতা তার আগের সকল পরিচয় ছাড়িয়ে যান।
নির্বাচিত হলে কী কী করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকারি যত বরাদ্দ আসবে সেগুলোর তথ্য সাইনবোর্ডে টাঙিয়ে দেব। ওই বোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকবে কোন এলাকার, কোন মসজিদ, কোন মন্দির, কোন রাস্তার জন্য কত টাকা বরাদ্দ এসেছে। একপয়সার দুর্নীতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।’
আখতার হোসেন বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণরা, সেই তরুণদের অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। শুধু তরুণ নয় সমাজের সচেতন মানুষেরও সাড়া পাচ্ছি। তারা নিজে থেকেই পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন।’
এই আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা জাহিদ হোসেন। তিনি কাউনিয়া হারাগাছ বাংলা বাজার উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। এ ছাড়া স্থানীয় একটি মসজিদের খতিব তিনি। জাহিদ বলেন, ‘এই নির্বাচনি এলাকার মানুষ ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায়। ফলে মানুষ ইসলামী আন্দোলনের দিকে ঝুঁকছে। নির্বাচিত হলে এলাকার সাম্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দুর্নীতি দূর করাই হবে মূল লক্ষ্য।’
এদিকে পীরগাছা উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ আবু নাসের মো মাহবুব ভেতরে ভেতরে নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। দল সিদ্ধান্ত দিলে মাঠে নেমে পড়বেন বলে জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বাম দলগুলোও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।