এই দেশে আর রাজার ছেলে রাজা হবে না, বংশানুক্রমিক ও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির অবসান ঘটবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি হবে মেধা, যোগ্যতা ও দেশপ্রেমের প্রমাণের ভিত্তিতে।’
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত জামায়াতের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
এর আগে, জামায়াত আমির নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পৃথক নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশে আর কোনো আধিপত্যবাদী রাজনীতি চলবে না। প্রতিবেশী দেশসহ সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে। অমর্যাদাকর কোনো সম্পর্ক আমরা চাই না। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই।’
দেশের সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ‘বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষের দেশ। সাঁওতালসহ সব জনগোষ্ঠীকে নিয়েই এই দেশ গড়ে উঠবে। জনগণের ভোট ও সমর্থনের মাধ্যমে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না।’
নারী ও শিশুদের প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বোনেরা-মায়েরা ঘরে, চলাচলে, কর্মস্থলে, সব জায়গায় নিরাপদ থাকবেন। মর্যাদার সঙ্গে শিশু জন্ম নেওয়ার পর তার পুষ্টি, স্বাস্থ্যের পরিচর্যার দায়িত্ব সরকারের। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনা খরচে শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে ইনশাআল্লাহ। আর সারা জিন্দেগী জাতিকে যারা উজাড় করে দিয়ে একটা বয়সে পৌঁছে যাবেন, তাদেরও চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে সরকার। প্রতিটি বিভাগীয় নগরী ও প্রতিটি জেলায় ইনশাআল্লাহ আমরা মেডিকেল কলেজ কায়েম করব এবং বিশেষায়িত হাসপাতালও গড়ে তুলব।’
নারীদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সচরাচর নারীদের সম্মানে কাজ করে আসছে। আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর বাংলাদেশকে নারীদের জন্য বসবাসের উপযোগী করে রাখব ইনশাআল্লাহ। এই দেশ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অথবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নয়, এই দেশ আমাদের সবার, সব শ্রেণির মানুষের, কৃষক, শ্রমিক, জনতার। আপনাদের মহামূল্যবান ভোট আগামী ১২ তারিখে দাঁড়িপাল্লায় প্রয়োগ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটকে সরকার গঠন করতে সহায়তা করুন।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যাদের অতীতেও খাসলত খারাপ ছিল, এখনো যারা লোভ সামলাতে পারেনি, সেই বিড়ালের হাতে গোস্ত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেবেন? এরা রাষ্ট্রের জনগণের মান এবং ইজ্জতের নিরাপত্তা এখনই দিচ্ছে না, তখনও দেবে না। আফসোস, তারাও মজলুম ছিলেন, কেন যে এখন বদলে গেলেন, বুঝতে পারলাম না। এখন বিভিন্ন জায়গার দখলদারিত্ব নিতে গিয়ে নিজেদেরই ২৩৪ জন শেষ। এখন আমাদের খুন করা শুরু হয়েছে, আমাদের গালি দেওয়া শুরু হয়েছে, যাদের মানুষ মারা গেল, যারা চাঁদাবাজি করে না, যারা কাউকে কষ্ট দেয় না, যারা দুর্নীতি করে না, যারা মামলা বাণিজ্য করে না, যারা বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষকে হয়রানি করে না, তাদের এখন বলা হচ্ছে জালেম!’
উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আপনারা এখন থেকে দোয়া করতে থাকেন, কোনো কালো চিল আসমান থেকে এসে ছুঁ মেরে যেন আমাদের স্বপ্নকে এলোমেলো করে দিতে না পারে। এখন থেকে পাহারা বসাবেন, কোনো ভোট ডাকাত, ভোট চোর, ভোট ইঞ্জিনিয়ার কাউকে এবার কোনো ছাড় নেই। সিনা মজবুত করে, হাত শক্ত করে আমাদের দাঁড়ায় যেতে হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা ইনশাআল্লাহ পারব, ইনশাআল্লাহ আমাদের পারতে হবে, না হয় বাংলাদেশ হেরে যাবে। সেই সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করার জন্য এখন থেকে আপনারা পাহারা বসাবেন ইনশাআল্লাহ। সারা দেশের পক্ষে এখন জোয়ার শুরু হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা এই জোয়ারকে যেন সংসদ ভবনে নিয়ে পৌঁছায় দেন এবং সংসদ ভবনে যারা যাবেন তারা যেন কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে না পড়েন। বরঞ্চ আল্লাহকে ভয় করে মানুষের প্রতি দায়যুক্ত থেকে তারা যেন কাজ করতে পারেন।’
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা কেরামত আলী। নগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডলের সঞ্চালনায় জনসভায় উপস্থিত ছিলেন দলটির নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের প্রার্থী অধ্যাপক মজিবুর রহমান, রাজশাহী-২ (সদর) আসনের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী, রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দূর্গাপুর) আসনের প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমান, রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ নাজমুল হক, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা আলম মিতু, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) জিএস এসএম ফরহাদ হোসেন প্রমুখ।
এনায়েত/এসজি/