জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোট শরিকদের মনে সৃষ্ট ক্ষোভ ও অভিমান দূর করতে সংরক্ষিত আসনে তাদের নারীনেত্রীদের মনোনয়ন দেবে বিএনপি। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েও জোটের শরিকদের যারা জিততে পারেননি, কিংবা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় থেকেও মনোনয়ন পাননি–এমন ত্যাগী নেতাদের স্ত্রী ও মেয়েকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। সংসদে গিয়ে কে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা বিবেচনা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। এর মধ্য দিয়ে জোট শরিকদের ‘ক্ষোভ ও অভিমান’ দূর করার চেষ্টা করছে বিএনপি।
এদিকে সংরক্ষিত আসনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির নারীনেত্রীদের তৎপরতা আরও বেড়েছে। কয়েক শ নারীনেত্রীর জীবনবৃত্তান্ত নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং গুলশানে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে জমা পড়েছে। এসব জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবার সংরক্ষিত আসনের জন্য দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ করবে বিএনপি। মনোনয়ন সংগ্রহ করা নারীনেত্রীদের নামের তালিকা যাচাই-বাছাই করবেন দলের পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্যরা। বিগত সময়ে বিএনপিতে অবদান ও আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা দেখে মূল্যায়ন করা হবে। বিএনপির ৩৬টি সংরক্ষিত আসন পেলেও যাচাই-বাছাই করে অন্তত ৫০-৬০ জন নারীনেত্রীর নাম বিবেচনার জন্য রাখা হবে। এরপর এলাকা নিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জানাতে তাদের পার্লামেন্টারি বোর্ডের মুখোমুখি হতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান খবরের কাগজকে বলেন, সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য বিষয়ে আলোচনা চলছে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জোট শরিকদের কতটি আসন দেওয়া হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে দলীয় ফোরামে এখনো আলোচনা হয়নি। বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা খবরের কাগজকে বলেন, জোটের শরিক দলের তিন-চারজন নারীনেত্রীকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের অবদান মূল্যায়ন করে ‘পুরস্কার’ হিসেবে এই মনোনয়ন দেওয়ার আলোচনা চলছে।
জানা গেছে, জোট শরিক গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আব্দুর রবের স্ত্রী ও জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব। আ স ম রব শারীরিক অসুস্থতার কারণে নির্বাচনে অংশ নেননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জোটের শরিক হিসেবে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনটি রবকে ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে এই আসনটি বিএনপির কাছে তানিয়া রবের জন্য ছাড় চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজপথে সক্রিয় থেকেও তানিয়া রব ছাড় পাননি। তাই তানিয়া রবকে সংরক্ষিত আসনে দেখার সম্ভাবনা বেশি।
গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক নেতা নাগরিক ঐক্যর সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বগুড়া-২ আসনটি প্রথমে ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিএনপির প্রার্থী মীর শাহে আলম মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় সেই সময়ে অভিমান থেকে জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন মান্না। পরে তিনি কেটলি প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিলেও হেরে যান। তাই এখন সংরক্ষিত আসনে মান্নার স্ত্রী মেহের নিগারকে সম্ভাব্য তালিকায় রেখেছে বিএনপি। তাকেও সংসদে দেখা যেতে পারে।
এ ছাড়া ঢাকা-১২ আসনে জোটের পরাজিত প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের মেয়ে ড. মোশরেকা অদিতি হকের নাম আলোচনায় আছে। অদিতি হক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এ ছাড়া গণসংহতি আন্দোলন থেকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকির স্ত্রী তাসলিমা আখতারের নাম আলোচনায় আছে। তিনি গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলনের নেত্রী ও আলোকচিত্রী। একই দলের শীর্ষ নেতা আরিফুল ইসলাম সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর তার স্ত্রী রেবেকা নীল সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আছেন।
অন্যদিকে ১২-দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) থেকে কাজী জাফরের মেয়ে জয়া কাজী, জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদার স্ত্রী রোকসানা শারমিন সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় আছেন। রোকসানা শারমিন ইংরেজি মাধ্যম সানিডেল স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। অন্যদিকে শরিক জোট থেকে ফরিদুজ্জামান ফরহাদের সহধর্মিণী ইমরান আক্তার কাকলির নাম বিবেচনায় রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে সৈয়দ এহসানুল হুদা ও নড়াইল-২ আসনে ফরহাদের বিপরীতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দুজনই পরাজিত হয়েছেন।
এ বিষয়ে রোকসানা শারমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শাসনামলে তার স্বামী সৈয়দ এহসানুল হুদা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এবং হামলা-মামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। আমরাও পরিবার হিসেবে নানা প্রতিকূলতা সহ্য করেছি। আমি নিজে নারী সমাজকে সংগঠিত করতে কাজ করেছি। দল যদি আমাকে সুযোগ দেয়, তাহলে শহিদ জিয়া, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করব।’
বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক খবরের কাগজকে বলেন, এ ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, সব দলই সংসদে সংরক্ষিত আসন ১০০ করার পক্ষে মত দিয়েছিল। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত করা হবে তা নিয়ে দ্বিমত এখনো রয়েছে। তার মতে, প্রত্যক্ষ ভোটে নারীনেত্রীরা নির্বাচিত হলে তাদের কণ্ঠস্বর জোরালো হবে, ভালো ভূমিকা রাখতে পারবেন।
এগিয়ে ১০ সাবেক সংসদ সদস্য
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির মধ্যে কক্সবাজার-১ আসনে হাসিনা আহমেদ ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনে রুমানা আহমেদ ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হয়েছিলেন। হাসিনা আহমেদ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের এবং রুমানা আহমেদ স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, শাম্মী আক্তার, রাশেদা বেগম হীরা, রেহানা আক্তার রানু, সুলতানা আহমেদ, ইয়াসমিন আরা হক, শিরীন সুলতানা সম্ভাব্য তালিকায় আছেন।
তালিকায় আছেন একাদশ ও ত্রয়োদশ নির্বাচনের ১০ প্রার্থী
২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ‘ভোট কারচুপি’ ও হামলা মামলার মধ্যেও অন্তত ১৪ জন নারী প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এবার সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী হিসেবে তাদের মূল্যায়ন করার ব্যাপারে দলের ভেতরে আলোচনা আছে। এরা হলেন বিএনপির সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন, কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা, পটুয়াখালী-২ আসনের সালমা আলম, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য জেবা আমিন খান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণী, বিএনপির ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুমের স্ত্রী শামীম আরা বেগম। আর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা ও সানজিদা ইসলাম তুলির নাম আলোচনায় আছে।
আলোচনায় নেতাদের স্ত্রী এবং মেয়েরা
সংরক্ষিত আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ ও ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, ড. আবদুল মঈন খানের মেয়ে মাহরীন খান, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের স্ত্রী হাসনা মওদুদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব আব্দুস সালাম তালুকদারের একমাত্র মেয়ে আর্কিটেক্ট সালিমা বেগম আরুণি, আরেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্রবধূ খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়া, সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিন চৌধুরী এবং সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন আলোচনায় আছেন।
আলোচনায় তরুণ নেত্রীরা
আলোচনায় আছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীন, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টুর বোন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, মহিলা দলের সাবেক সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা ও খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের দুবারের ভিপি ফারজানা রশিদ লাবনী, বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, মহিলা দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, সহ-স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শামীমা আক্তার রুবী, সাবেক সহসভাপতি সুলতানা জেসমিন (জুঁই), দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা দলের সদস্যসচিব নাসিমা আক্তার (কেয়া), সাবেক সাধারণ সম্পাদিকা শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রোখসানা খানম, আয়েশা সিদ্দিকা ও নেওয়াজ হালিমা, স্বেচ্ছাসেবক দলের অ্যাডভোকেট শাহিনুর বেগম, ময়মনসিংহ জেলা মহিলা দলের সহসভাপতি ফাহসিনা হক লিরা, খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রোকেয়া চৌধুরী।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম, চট্টগ্রাম মহিলা দলের মনোয়ারা বেগম মনি, ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজ চেয়ারম্যানের স্ত্রী সুলতানা পারভীন, ড্যাবের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. জাহানারা লাইজু, পিরোজপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এলিজা জামান, বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শাহিদা আক্তার ও চিতলমারী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান রুনা গাজী আলোচনায় আছেন।