জীবনে কমপক্ষে একবার দরুদ পাঠ করা ফরজ। কোনো কোনো ফকিহ বলেছেন, ওয়াজিব। কোনো সভা-সেমিনার বা মজলিশে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে বা শুনলে কমপক্ষে একবার দরুদ পড়া ওয়াজিব। একই সভা-সেমিনার বা মজলিশে বারবার নাম উচ্চারিত হলে প্রতিবার দরুদ পড়া মুস্তাহাব। কোনো ব্যক্তি যতবার দরুদ পড়বেন; পবিত্র কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশের তত বেশি আমলকারী হিসেবে তিনি গণ্য হবেন। (দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের বিধান, মুফতি সালমান মানসুরপুরী, অনুবাদ : মাওলানা মুহাম্মাদ নাঈম, রাহনুমা প্রকাশনী, খণ্ড : ০৩, পৃষ্ঠা : ৫২৭)
বেশ কিছু কারণ রয়েছে; যেসব কারণে প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের উচিত আবশ্যকভাবে দরুদ পাঠের আমল করা। দরুদ পাঠের বিভিন্ন উপকারিতা ও ফজিলত রয়েছে। নিচে দরুদ পাঠের এমন ১০টি কারণ, উপকারিতা ও ফজিলতের কথা তুলে ধরা হলো—
১. আল্লাহর রহমত লাভ : আবদুল্লাহ বিন আমন বিন আস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করবে; আল্লাহতায়ালা তার প্রতি দশবার রহমত নাজিল করবেন। (মুসলিম, হাদিস : ৩৮৫)
২. ফেরেশতাদের দোয়া লাভ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে এবং যতক্ষণ সে দরুদ পাঠরত থাকে; ততক্ষণ ফেরেশতাগণ তার জন্য দোয়া করতে থাকেন। অতএব বান্দা চাইলে তার দরুদ পাঠের পরিমাণ কমাতেও পারে, আবার বাড়াতেও পারে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৯০৭; মুসনাদে আহমাদ, ২/১৮৭)
৩. পাপমোচন ও মর্যাদা বৃদ্ধি : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, সেই ব্যক্তির ওপর আল্লাহ ১০টি রহমত বর্ষণ করেন, তার ১০টি পাপমোচন করেন এবং ১০ ধাপ মর্যাদার স্তর উন্নীত করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৪/২৯; নাসায়ী, হাদিস : ১২৯৭)
৪. কিয়ামতের দিবসে ও জান্নাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য লাভ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পড়বে; কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৪৮৪)। তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি যত বেশি দরুদ পাঠ করবে; জান্নাতে সে ব্যক্তি তত বেশি আমার নিকটবর্তী হবে।’ (বাইহাকি; আস-সুনানুল কুবরা, ৩/২৪৯)
রুওয়াইফি ইবনে ছাবিত আল আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বরেছেন, ‘যে ব্যক্তি দরুদ পাঠ করবে; তার জন্য আমার সুপারিশ অবধারিত হয়ে যাবে।’ (আল-মুজামুল কাবির, তবারানি ৫/৪৪৮১; মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/২৫৪)
৫. কিয়ামতের দিবসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত লাভ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরুদ পাঠ করল অথবা আমার জন্য ‘অসিলার’ দোয়া করল; কিয়ামতের দিন তার ব্যাপারে শাফআত করা আমার জন্য কর্তব্য। (মুসলিম, হাদিস : ৩৮৫; আবু দাউদ, হাদিস : ৫২৭)
৬. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে দরুদ পৌঁছানো হয় : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আমার প্রতি দরুদ পেশ করো। কারণ তোমরা যেখানেই থাকো না কেন; তোমাদের পেশকৃত দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭, ২০৫২; নাসায়ী, হাদিস : ১৬৭৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১০৮৫)
৭. চিন্তা ও ক্লেশ দূরীভূত হয় এবং উদ্দেশ্য পূরণ হয় : উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বললেন, ‘আমি আপনার ওপর অনেক বেশি দরুদ পাঠ করি। এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি আমাকে বলে দিন, আমি আপনার ওপর দরুদ প্রেরণের জন্য কতটুকু সময় নির্দিষ্ট করব? রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশ কয়েকবার বললেন, তোমার যা মন চায়। যদি আরও বেশি করো, তা হলে তা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে। সর্বশেষ সাহাবি বললেন, আমি আমার সবটুকু সময়ই আপনার ওপর দরুদ পাঠ করার জন্য নির্দিষ্ট করে দেব? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তা হলে তা তোমার চিন্তা ও ক্লেশের জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ মাফ করা হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৭) অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তবে তো তোমার মাকসুদ (উদ্দেশ্য) পূরণ হবে, তোমার গুনাহ মাফ করা হবে।’ (তিরমিজি, ২/৭২; মাজমাউয যাওয়াইদ ১০/২৪৮; মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, ৬/৪৫)
৮. অন্তর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয় : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আমার প্রতি দরুদ পাঠ করো। নিশ্চয়ই আমার ওপর দরুদ পাঠ করা তোমাদের অন্তরের পবিত্রতা।’ (সিলসিলাতুস সহিহাহ, হাদিস : ৩২৬৮)
৯. দোয়া কবুল হয় : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক দোয়া-দরুদ পাঠ না করা পর্যন্ত আড়াল করে রাখা হয়, মানে দোয়া কবুল করা হয় না। (সহিহুল জামে, হাদিস : ৪৫২৩; সিলসিলাতুস সহিহাহ, হাদিস : ২০৩৫)
ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমার রাসুল (সা.)-এর ওপর দরুদ না পড়বে, ততক্ষণ তোমার দোয়া আসমানে যাবে না। আসমান ও জমিনের মাঝে থেমে থাকবে। (তিরমিজি, ১/১১০)
১০. গরিবের দরুদ পাঠ সাদাকাস্বরূপ : আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলমানের দান করার সামর্থ্য নেই সে যেন দরুদসহ দোয়া পাঠ করে, তা হলে এটা তার জন্য জাকাত (সাদাকা) হিসেবে গণ্য হবে।’ (ইবনে হিব্বান, ৩/১৮৫)
লেখক : আলেম ও গবেষক।