আজকের এই আধুনিক যুগে হাজারও মতবাদ, দর্শন আর মনগড়া জীবনরীতির ভিড়ে মানুষ প্রায়ই সঠিক পথের দিশা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মুক্তির আসল চাবিকাঠি কোথায়? হযরত জাবের (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, নিশ্চয়ই শ্রেষ্ঠ বাণী হলো আল্লাহর কিতাব এবং শ্রেষ্ঠ হেদায়াত বা আদর্শ হলো মুহাম্মাদ (সা.)-এর হেদায়াত। তিনি সতর্ক করেন, দ্বীনের মধ্যে যেকোনো নতুন সৃষ্টি বা মনগড়া উদ্ভাবনই হলো নিকৃষ্টতম কাজ, যা মানুষকে নিশ্চিত পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায় এবং যার শেষ পরিণতি জাহান্নাম (মুসলিম, ১৪১; সুনানে নাসাঈ, ১৫৭৮)।
সমাজে কিছু মানুষের মানসিকতা ও কাজ স্রষ্টার কাছে চরম ঘৃণিত রূপ নেয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, তিন শ্রেণির ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত। তারা হলো–হারাম বা নিষিদ্ধ এলাকায় অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তি, ইসলামের ভেতর জাহেলি যুগের কুসংস্কার বা রীতিনীতি চালুর আকাঙ্ক্ষাকারী এবং স্রেফ অন্যায়ভাবে রক্তপাতের উদ্দেশ্যে অন্যের রক্ত কামনা করা ব্যক্তি (বুখারি, ১৪২)।
মানুষের মুক্তি ও অবাধ্যতার সমীকরণ বোঝাতে ফেরেশতারা এক অলৌকিক উপমা দিয়েছিলেন। রাসুল (সা.) যখন নিদ্রিত ছিলেন (যার চক্ষু নিদ্রিত হলেও অন্তর ছিল জাগ্রত), তখন ফেরেশতারা বলেন, যেমন এক ব্যক্তি গৃহ নির্মাণ করে ভোজের আয়োজন শেষে একজন আহ্বায়ক পাঠালেন; যে সাড়া দিল সে খেতে পারল, আর যে দিল না সে বঞ্চিত হলো। এই উপমার ব্যাখ্যায় তারা বলেন, গৃহটি হলো জান্নাত, আহ্বায়ক হলেন মুহাম্মাদ এবং নির্মাতা স্বয়ং আল্লাহ। অতএব, মুহাম্মাদ (সা.)-এর আনুগত্যই আল্লাহর আনুগত্য, আর তিনিই মানুষের মধ্যে ঈমান ও কুফরের পার্থক্যকারী (বুখারি, মিশকাত ১৪৪)।
অনেকেই মনে করেন, সংসার বা স্বাভাবিক জীবন ত্যাগ করে কেবল বৈরাগ্য সাধনেই বুঝি পরম ধর্ম। একবার তিনজন ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর ইবাদতের পরিমাপ শুনে নিজেদের আমলকে কম মনে করে একজন সারা রাত নামাজ পড়া, একজন আজীবন রোজা রাখা এবং অন্যজন বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন। রাসুল (সা.) তাদের এই অতি-ধার্মিকতার ভুল ভেঙে দিয়ে বলেন, আমি তোমাদের চেয়ে বেশি আল্লাহভীরু হওয়া সত্ত্বেও রোজা রাখি ও ছাড়ি, সালাত পড়ি ও ঘুমাই এবং বিয়েও করেছি। অতএব, যে আমার সুন্নাত বা জীবনপদ্ধতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার শরিয়াতের অন্তর্ভুক্ত নয় (বুখারি, মুসলিম, ১৪৫)।
সাহাবি হযরত ইরবায বিন সারিয়াহ (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রাসুল (সা.) এমন মর্মস্পর্শী ভাষায় বিদায়ী খুতবা দিলেন যে সবার চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেল। তিনি ভবিষ্যৎ মতভেদের যুগে নিজের সুন্নাত ও খোলাফায়ে রাশেদ্বীনের সুন্নাতকে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রাখার নির্দেশ দেন (আবু দাউদ, ১৬৫)। একইভাবে হযরত আলি (রা.) বর্ণিত হাদিসে মদিনার পবিত্র ভূমিতে কোনো মনগড়া প্রথা বা বিদ‘আত চালু করা অথবা বিদ‘আতিকে আশ্রয় দেওয়ার বিরুদ্ধে আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমস্ত মানুষের লানতের কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ)।
দ্বীনের নামে নিজস্ব মনগড়া রীতি বা বিজাতিদের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং রাসুল (সা.)-এর দেখানো সুন্নাহর সরল পথ আঁকড়ে ধরাই হোক আমাদের জীবনযাত্রার মূল ভিত্তি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক