‘ফিতান’ শব্দটি আরবি ‘ফিতনা’ শব্দের বহুবচন। এর মূল অর্থ পরীক্ষা। অন্যায়, অপরাধ, বিচ্যুতি, পাপ, অশ্লীলতা, জুলুম, যুদ্ধবিগ্রহ; অন্যকথায় দ্বীন ও নৈতিকতা, শরিয়ত ও মনুষ্যত্ব, নিয়ম ও শৃঙ্খলার বিপরীত সবকিছু তথা সকল বদ-দ্বীনি, ধর্মহীনতা, অনৈতিকতা, অমনুষ্যত্ব ও বিদ্রোহ- বিশৃঙ্খলাকে ‘ফিতনা’ বলে অভিহিত করা হয়। সংক্ষেপে বললে ভালোর বিপরীতে সকল মন্দকেই ‘ফিতনা’ বলা যায়। (কিয়ামতের আলামত ও শেষ যুগের ভয়াবহ ফিতনা, মীযান হারুন, সমকালীন প্রকাশন, পৃষ্ঠা : ২৩ )
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদিসে মুসলিম উম্মাহকে ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক করে গিয়েছেন। কিয়ামতের নিদর্শন হিসেবে প্রকাশ পাবে—এমন অসংখ্য ফিতনার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। সেজন্য আমরা যদি কিয়ামতের নিদর্শনগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিই, দেখব সেগুলোর মূলকথা হলো—ফিতনা ও ফিতনারোধের চেষ্টা। আল্লাহর রাসুল বলেছেন, ‘কিয়ামত যত ঘনিয়ে আসবে, পৃথিবীতে ফিতনার পরিমাণও তত বৃদ্ধি পাবে। জগতের মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক, আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে নানান ফিতনায় (সংকট ও পরীক্ষায়) জড়িয়ে পড়বে। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ২৩)
এক. আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অন্ধকার রাতের মতো ধারাবাহিক ফিতনা ধেয়ে আসার আগেই আমলগুলো করে নাও। সে-সময় সকালে মুমিন থাকা ব্যক্তি সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে। আবার সন্ধ্যায় মুমিন থাকা ব্যক্তি সকালে কাফির হয়ে যাবে। মানুষ সামান্য দুনিয়ার বিনিময়ে নিজের দ্বীন বিক্রি করবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৮; তিরমিজি, হাদিস : ২১৯৫)
দুই. আবু হোরায়রা (রা.) থেকে অন্য হাদিসে এসেছে ‘ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবে না, যতক্ষণ না র্সবত্র ফিতনায় ভরে যাবে। মিথ্যার প্রসার ঘটবে। হত্যা ও খুন-খারাবি বৃদ্ধি পাবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৭০৬২; মুসলিম, হাদিস : ২৬৭২)
তিন. আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস (রা.) থেকে বণর্তি, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রথম অংশকে নিরাপদে রাখা হয়েছে; শেষাংশ নানা মুসিবত ও সংকটে আপতিত হবে। একের পর এক বড় বড় ফিতনা ধেয়ে আসবে; যার পরেরটার সামনে পূর্বেরটা হালকা মনে হবে। যখনই কোনো ফিতনা আসবে, মুমিন ব্যক্তি বলবে, এই আমার ধ্বংস চলে এসেছে! কিন্তু সেটা চলে যাবে। আবার নতুন ফিতনা আসবে। মুমিন বলবে, এই এটার মাঝেই আমার বরবাদি রয়েছে! সুতরাং তোমাদের যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়, সে যেন আল্লাহ এবং পরকালের ওপর ঈমান রেখে মৃত্যুবরণ করে; আর মানুষের সঙ্গে তাই করে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে। (মুসলিম, হাদিস : ১৮৪৪; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯৫৬)
এসব হাদিসে আখেরি জামানায় সব রকমের ফিতনার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কথা সুষ্পষ্ট। তাই মুমিনের জন্য আবশ্যক হলো—ফিতনা থেকে যথাসাধ্য দূরে অবস্থান করা।
চার. হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘ফিতনা মানুষের অন্তরে চাটাইয়ের বুননের মতো একটার পর একটা পতিত হতে থাকে। যে অন্তরে সেগুলো গেঁথে যায়, তাতে একটি করে কালো দাগ পড়ে। আর যে অন্তর সেগুলো প্রত্যাখ্যান করে তাতে সাদা ছাপ পড়ে। এভাবে অন্তর দুই প্রকারের। একটি হচ্ছে পাথরের মতো শ্বেতশুভ্র। আকাশ ও মাটি যতদিন থাকে কখনো কোনো ফিতনা তার ক্ষতি করতে পারে না। অপরটি হলো উলটানো কালো কলসির মতো; যা ভালোমন্দ কিছুই চেনে না। প্রবৃত্তির বাইরে বের হতে পারে না!’ (মুসলিম, হাদিস : ১৪৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৭২)
সুতরাং প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের কর্তব্য হলো, ফিতনা সম্পর্কে জানা, সচেতন থাকা এবং ফিতনা থেকে যথাসম্ভব নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করা। কারণ ফিতনার সামনে দুঃসাহসিকতা দেখানো পাহাড় থেকে লাফ দেওয়া কিংবা সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার মতো। যেখান থেকে বেঁচে ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
লেখক : আলেম ও গবেষক