আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি, তিনি এরশাদ করেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর সবাই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে। ইমাম তথা জনতার নেতা একজন দায়িত্বশীল; তিনি তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ দায়িত্বশীল তার পরিবারের; সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। স্ত্রী দায়িত্বশীল তার স্বামীর গৃহ ও সন্তানের; সে জিজ্ঞাসিত হবে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে। মানুষের (দাস) ভৃত্য দায়িত্বশীল মুনিবের সম্পদের, সে জিজ্ঞাসিত হবে তার মুনিবের সম্পদ সম্পর্কে। অতএব, সতর্ক থেকো, তোমরা সবাই দায়িত্বশীল আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে।’(বুখারি, ৭১৩৮)
আপনি একজন পিতা বা অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানের ব্যাপারে কতটা দায়িত্বশীল তা ভেবে দেখুন। শুধু তাদের অন্ন-বস্ত্রের জোগান দেওয়াই শুধু আপনার দায়িত্ব নয়, তাদের সুশিক্ষা দেওয়া, ইসলামের প্রয়োজনীয় জ্ঞান শেখানো এবং ইসলামি মূল্যবোধ ও শিষ্টাচারের ওপর তাদের গড়ে তোলাও আপনার দায়িত্ব। আজকাল অনেক বাবা-মাই মনে করেন—সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা পর্যন্তই তাদের দায়িত্ব সীমিত। কখনো খেলাধুলা ও বস্তুগত আরও কিছুকে এর সঙ্গে যোগ করা হয়। অথচ তারা তাদের সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনতে পারেন না। কারণ তাদের গুরুত্বের সবটুকু জুড়ে থাকে শারীরিক প্রতিপালন, কখনো বুদ্ধিবৃত্তিক লালনকেও এর সঙ্গে যোগ করা হয়। তবে রুহ তথা আত্মার খোরাক সম্পর্কে উদাসীনতা দেখানো হয়। অথচ বাস্তবে মানুষ প্রথমে রুহ, তারপর বুদ্ধি; অতঃপর দেহ। বলা বাহুল্য, রুহের খোরাক হলো ইসলামি শিক্ষা।
সন্তানকে দুনিয়াদারির সঙ্গে সঙ্গে আখেরাতের প্রস্তুতির শিক্ষা দিতে হবে। জাগতিক সব শিক্ষা-দীক্ষার পাশাপাশি পারলৌকিক জ্ঞানও দিতে হবে। শরিয়তের যাবতীয় হুকুম-আহকামের জ্ঞান শেখাতে হবে। শুধু ধারণা দেওয়াই যথেষ্ট নয়, সার্বিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে তার অনুশীলনও করাতে হবে। মৌলিক দ্বীনি জ্ঞান এবং আমল-ইবাদত শেখাতে হবে। আর ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক চর্চিত আমল হলো নামাজ। সন্তানকে তাই নামাজ আদায় শেখাতে হবে। শিক্ষা দিতে হবে নামাজের প্রয়োজনীয় জ্ঞান।
কোরআন শিক্ষা দেওয়া, হালাল-হারামের জ্ঞান, আল্লাহ-রাসুলের প্রতি বিশ্বাস ইত্যাদি শেখানোও অপরিহার্য। হয় আপনি শেখাবেন, নয়তো মাদরাসায় পড়িয়ে কিংবা সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ধর্মীয় শিক্ষকের মাধ্যমে শেখাতে হবে। কারণ, একজন মুসলিমের জন্য যে কাজগুলো ফরজ, তা করার জন্য এবং যে কাজগুলো হারাম, তা থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন ফরজ। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ, ৫/২২৪)
একজন মুসলিম হিসেবে আমরা সন্তানকে বুদ্ধি বিকাশের প্রথম প্রহরেই দ্বীন সম্পর্কে ধারণা দিতে ইচ্ছুক থাকি। সন্তান কথা বলা শুরু করতেই আমরা অনেকে আল্লাহ, আব্বু-আম্মু শিক্ষা দিই। কালেমায়ে শাহাদাহ শেখাই। তারপর ক্রমেই তাকে নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইবাদতের সঙ্গে পরিচিত করাই। কিন্তু যে কাজটি আমরা করি না, তা হলো সন্তানকে শুধু কালেমা শেখানোই নয়; তাকে তাওহিদ শিক্ষা দেওয়া, ঈমানের মোটামুটি বিস্তারিত শিক্ষা দেওয়া এবং তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দিকগুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। জুনদুব বিন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে থাকতাম। তখন আমরা টগবগে যুবক ছিলাম। সে সময় আমরা ঈমান শিখি আমাদের কোরআন শেখার আগে। এরপর আমরা কোরআন শিখি। এতে করে আমাদের ঈমান বেড়ে যায় বহুগুণে।’(ইবনে মাজাহ, ৬১)
সন্তান যখন আধো আধো ভাষায় অস্ফুট কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করে, প্রথম যখন তার বাকপ্রতিভার অভিষেক ঘটে, তখন ঈমানের শাখাগুলোর মধ্যে প্রথম ও সর্বোচ্চটি তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’শেখানোর চেষ্টা করা উচিত।
আমাদের ভেবে দেখা দরকার, নিজ সন্তানকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। কোথায় আমরা আর কোথায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবি? কোথায় তাদের সন্তান আর কোথায় আমাদের সন্তান? ‘সুতরাং যাকে আল্লাহ হিদায়েত করতে চান, ইসলামের জন্য তার বুক উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে ভ্রষ্ট করতে চান, তার বুক সঙ্কীর্ণ-সঙ্কুচিত করে দেন—যেন সে আসমানে আরোহণ করছে। এমনিভাবে আল্লাহ অকল্যাণ দেন তাদের ওপর, যারা ঈমান আনে না।’(সুরা আনআম, ১২৫)
আজকাল আমরা ভালো চাকরি আর বিপুল আয়-রোজগারকেই সন্তানদের শিক্ষা ও জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে দিচ্ছি। অথচ আমাদের যে পরকালীন একটি জীবন আছে—যার শুরু আছে অথচ শেষ নেই, যেখানে হবে আমাদের প্রতিটি কর্মের হিসাব-নিকাশ—সেদিকে যেন কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। থাকলে আমরা সন্তানদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে এই বিষয়টিও বিবেচনায় নিতাম।
লেখক : খতিব, আন-নুর জামে মসজিদ, টঙ্গী, গাজীপুর