পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘মুসার মাকে আমি ইঙ্গিতে (ইলহামযোগে) নির্দেশ করলাম, শিশুটিকে স্তন্য দান করতে থাকো। যখন তার সম্পর্কে কোনো আশঙ্কা করবে তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসুল বানাব। তখন ফেরাউনের (পরিবারের) লোকজন তাকে (শিশু মুসাকে নদী থেকে) উঠিয়ে নিল।…ফেরাউনের স্ত্রী বলল, ‘এই শিশু আমার ও তোমার নয়ন-প্রীতিকর। একে হত্যা করো না, সে আমাদের উপকারে আসতে পারে, আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭-১০)
মুসা (আ.) ছিলেন বনি ইসরায়েলের একজন নবী। মিসরে প্রেরিত হয়েছিলেন। সেসময় মিসরের বাদশাহ ছিল ফেরাউন মিনফাতাহ। ফেরাউন ছিল তৎকালীন বাদশাহদের উপাধি। রিমসিসের ১৫০ সন্তানের মধ্যে মিনফাতাহ ছিল ত্রয়োদশ সন্তান। (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আব্দুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৫)
বনি ইসরায়েলের সঙ্গে ফেরাউনের শত্রুতা ছিল চরমে। সে বনি ইসরায়েলদের ওপর সব সময় অত্যাচার-নির্যাতন চালাত। এর মধ্যে যখন তার দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় জ্যোতিষী ও গণকরা বলল, ইসরায়েলি এক বালকের দ্বারা তার রাজত্বের বিনাশ ঘটবে। ফেরাউন তখন ইসরায়েলি বংশে জন্ম নেওয়া পুত্রসন্তানদের হত্যার আদেশ জারি করল। তাই এই বংশের কোনো নারী সন্তানসম্ভবা হলেই বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হতো। রাজার নিয়োজিত নারী নিরাপত্তারক্ষীরা পুত্রসন্তান জন্মালে হত্যা করত। কন্যাসন্তান হলে কিছু বলত না।
এক দিন মুসার মা মুসাকে প্রসব করলেন। তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি ফেরাউনের কবল থেকে সন্তানকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে সিন্দুকে ঢুকিয়ে নীল নদে ভাসিয়ে দেন। মেয়েকে বললেন, ‘একটু লক্ষ রেখো, কোথায়, কোন তীরে গিয়ে পৌঁছে।’
নদীর ঢেউ তাকে ধীরে ধীরে তার শত্রু ফেরাউনের কাছে নিয়ে যায়। তার স্ত্রী এই ফুটফুটে বাচ্চা দেখে তাকে লালন-পালনের চিন্তা করেন। ফেরাউন শুরুতে রাজি ছিল না। কিন্তু স্ত্রীর যৌক্তিক মনোভাবের কাছে সে অসহায় হয়ে পড়ে। এভাবেই ফেরাউনের মহলে পৌঁছে গেলেন মুসা (আ.)। (তাফসিরে রুহুল মায়ানি, সুরা কাসাসের ১৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)
শিশু মুসার জন্য দুগ্ধ দানকারিণী ধাত্রীর প্রয়োজন দেখা দিল। রাজমহলের ধাত্রীদের ডেকে পাঠানো হলো। কিন্তু সে কোনো রমণীর স্তনে মুখই দেয় না। কারণ আল্লাহ তো মুসার মাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সন্তানকে তার কাছে ফিরিয়ে দেবেন। মুসা (আ.)-এর বোন মরিয়ম সব অবস্থা দেখছিলেন। তিনি বললেন, ‘অনুমতি পেলে আমি একজন ধাত্রীর সন্ধান দিতে পারি। তিনি অত্যন্ত সৎ স্বভাবশালিনী এবং এই কাজের জন্য খুবই উপযোগী। নির্দেশ পেলে বরং এখনই তাকে আমি আমার সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারি।’
ফেরআউনের স্ত্রী ধাত্রীকে আনার জন্য নির্দেশ দিলেন। আর মুসা (আ.)-এর বোন মাকে নিয়ে আসার জন্য আনন্দচিত্তে বাড়ির দিকে চলে গেলেন।
মুসার মা আল্লাহর দেওয়া প্রতিশ্রুতির অপেক্ষা করছিলেন। তার মেয়ের কাছে সুসংবাদের বার্তা শুনে পথ চললেন রাজপ্রাসাদের দিকে। কলিজার ধন কোলে নিলেন। বুকের সঙ্গে জড়াতেই মুসা (আ.) আল্লাহর ইচ্ছায় দুধ পান করতে শুরু করেন। (তাফসিরে রুহুল মায়ানি, খণ্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ৩-৫)
মুসা (আ.) মায়ের যত্নে বোনের আদরে আসিয়ার তত্ত্বাবধানে ফেরাউনের ঘরে বড় হতে থাকেন। দীর্ঘ পরিক্রমা এবং অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে মুসা (আ.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে তাড়া করতে গিয়ে ফেরাউন নীল নদে ডুবে মারা যায়।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক