রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমন ও প্রস্থান কিয়ামতের অন্যতম আলামত। একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি এমন সময় প্রেরিত হয়েছি যখন আমার মাঝে আর কিয়ামতের মাঝে এটুকু ব্যবধান রয়েছে—এ কথা বলে তিনি শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল একত্র করে দেখান।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৫০৫)
অর্থাৎ দুই আঙুলের মতো কাছাকাছি সময়ে। উক্ত হাদিসটি আবু হুরায়রা, আনাস ইবনে মালেক, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ, জাবের ইবনে সামুরা, সাহল ইবনে সাদসহ বিভিন্ন সাহাবি থেকে বহু গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। বুরায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি ও কিয়ামত এক সঙ্গে প্রেরিত হয়েছি। মনে হচ্ছিল আমার আগমনের সঙ্গেসঙ্গেই কিয়ামত হয়ে যাবে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৩৪১৩)
ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি কিয়ামতের আগ-মুহূর্তে প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৫২১০)
আউফ ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের আগে ৬টি বিষয় গণনা করো—এক. আমার মৃত্যু। দুই. বায়তুল মাকদিস বিজয়। তিন. এক মারাত্মক মহামারি—যা তোমাদের ছাগলের পালের মতো বিলুপ্ত করে দেবে। চার. সম্পদের সমৃদ্ধি। ফলে কোনো ব্যক্তিকে তখন একশত দিনার দেওয়া হলেও সে খুশি হবে না! পাঁচ. এক ভয়ংকর ফেতনা; আরবদের কোনো ঘর যার বাইরে থাকবে না। ছয়. এক সন্ধি—যা তোমাদের ও রোমানদের মাঝে সংঘটিত হবে; কিন্তু তারা তোমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। আশিটি পতাকা তলে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হবে। প্রত্যেক পতাকার নিচে থাকবে ১২ হাজার সৈন্য!’ (বুখারি, হাদিস: ৩১৭৬)
উল্লিখিত হাদিসে থেকে বুঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যু কিয়ামতের নিদর্শন। কারণ এর মধ্য দিয়ে আকাশের সঙ্গে মাটির সরাসরি সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়ে গেছে। ওহির (প্রত্যাদেশ) দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। পৃথিবী তার সার্থক সময় পার করে ফেলেছে। এখন শুধু কিয়ামতের অপেক্ষা। এজন্যই সাহাবিগণ নবিজির ইন্তেকালের পরে বলেছিলেন, ‘তিনি যেদিন মদিনায় এসেছিলেন সেদিন সব কিছু আলোকিত হয়ে উঠেছিল। আর যেদিন তিনি চলে গেলেন, সেদিন সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল। আমরা তাকে দাফন করে হাত ঝাড়তে না ঝাড়তেই নিজেদের অচেনা মনে হতে লাগল!’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৬১৮)
কারণ তাঁর অস্তিত্বের সৌরভে সুরভিত পৃথিবী আর তিনি-হীনা পৃথিবী কখনোই সমান নয়। তাঁর মৃত্যু মুসলিমদের কোমর ভেঙে দিয়েছে। অসহায় করে ফেলেছে! তাদের নানা সংকট ও মুসিবতে জড়িয়ে ফেলেছে। স্বয়ং তিনিও সেটা জানিয়ে গিয়েছেন। এক রাতে তিনি সাহাবিদের সামনে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তারকারা আকাশের সুরক্ষা। যখন তারকাগুলো থাকবে না তখন আকাশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তেমনি আমি আমার সাহাবিদের জন্য সুরক্ষা। যখন আমি চলে যাব, আমার সাহাবিরা বিপদে আক্রান্ত হবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৩১)
হয়েছেও তাই। তার চলে যাওয়ার পর থেকেই মুসলিম উম্মাহ এতিম হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে নানা ফিতনার মাঝে ডুবে গিয়েছে। আজ প্রায় দেড় হাজার বছর পরেও মুসলিম উম্মাহ প্রতিটি ক্ষণে তার শূন্যতা অনুভব করছে। তিনি না থাকায় নানা সংকটে জর্জরিত রয়েছে; বরং তিনি না থাকার চেয়ে মুসলিম উম্মাহর বড় বিপদ আর নেই। তিনি নিজেও সে বাস্তবতা এভাবে বলে গিয়েছেন, ‘আমার উম্মতের কেউ আমাকে হারানোর চেয়ে বড় কোনো মুসিবতে আক্রান্ত হবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৫৯৯)
লেখক: আলেম ও গবেষক