আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় আমি তার নাম রেখেছি মারইয়াম। আর নিশ্চয় আমি তাকে ও তার সন্তানদের বিতাড়িত শয়তান থেকে আপনার আশ্রয় দিচ্ছি। তারপর তার প্রতিপালক তাকে ভালোভাবে কবুল করলেন এবং তাকে উত্তমরূপে লালন-পালন করলেন এবং তিনি তাকে জাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে রেখেছিলেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩৬-৩৭)
ইমরানের স্ত্রীর হান্নাহ বিনতে ফাখুজের মেয়ের নাম রাখা হলো মারইয়াম। সুরিয়ানি ভাষা মতে এর অর্থ খাদেম বা সেবক। তাকে (মারইয়াম) যেহেতু তার মা (হান্নাহ) পবিত্র উপাসনাগৃহে (মসজিদুল আকসা) ওয়াকফ করার মান্নত করেছিলেন, সেই হিসেবে এই নামই ছিল তার জন্য যথার্থ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। (ফাতহুল বারি, আল্লামা আসকালানী, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৬৫)
হজরত মারইয়াম (আ.) যখন বড় হলেন এবং বুদ্ধি-বিবেচনার বয়সে পৌঁছালেন; তখন একটি প্রশ্ন সামনে এলো, পবিত্র উপাসনাগৃহের (মসজিদের) এই আমানত কার হাতে অর্পণ করা হবে? কে হবেন তার তত্ত্বাবধায়ক? তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী কাহিনদের অনেকেই তাকে (মারইয়াম) লালন-পালন করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। পবিত্র এই আমানতের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার আশায় ছিলেন অনেকেই।
তবে মারইয়ামের তত্ত্বাবধানের জন্য হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর চেয়ে অধিক উপযুক্ত আর কেউ ছিলেন না। কারণ তিনি ছিলেন মারইয়ামের খালা ইয়াশির স্বামী, পবিত্র উপাসনাগৃহের সম্মানিত কাহিন এবং আল্লাহতায়লার নবীও। হজরত মারইয়ামের তত্ত্বাবধানের জন্য তিনি সবার আগে নিজের নাম পেশ করলেন। কিন্তু আরও অনেকেই যেহেতু আকাঙ্ক্ষা জানিয়েছেন ফলে তাদের পরস্পরের মধ্যে কলহ-বিবাদের সম্ভাবনা দেখা দিল। অবশেষে গণ্যমান্যদের পরামর্শে সিদ্ধান্ত হলো, লটারির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে। (তাফসীরে আনওয়ারুল কোরআন, মাওলানা আবুল কালাম মাসুম, ইসলামিয়া কুতুবখানা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৫১)
ইসরায়েলি রেওয়ায়েতগুলো বর্ণনা মতে, তিনবার লটারি করা হয়েছিল। লটারির প্রচলিত পদ্ধতি মেনে কাহিনরা প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ কলম নদীতে ছুড়ে মারলেন। কিন্তু প্রতিবারই হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর নাম উঠে আসছিল। এরপর সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো জাকারিয়া (আ.)-এর সঙ্গে গায়েবি সাহায্য রয়েছে। সুতরাং পবিত্র এ আমানত জাকারিয়া (আ.)-এর হাতে তুলে দেওয়া হোক। সবাই আনন্দের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৬০)
আল্লাহতায়লা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘এ হলো অদৃশ্যের সংবাদ, যা আমি আপনাকে পাঠিয়ে থাকি। আর আপনি তো তাদের কাছে ছিলেন না, যখন তারা প্রতিযোগিতা (লটারি) করছিল- কে প্রতিপালন করবে মারইয়ামকে এবং আপনি তাদের কাছে ছিলেন না, যখন তারা ঝগড়া করছিল।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত নং-৪৪)
বনি ইসরায়েলের কাহিনরা নদীতে কলম ফেলে লটারি করে মারইয়াম (আ.)-এর তত্ত্বাবধান লাভের লটারিতে অংশগ্রহণ করেছিল। (তাফসীরে কুরতুবী, সুরা আলে ইমরানের ৪৪ নং আয়াতের তাফসির দ্রষ্টব্য) তৎকালীন সমাজের প্রথা অনুযায়ী লটারির করার জন্য সব কাহিন নিজ নিজ কলমকে নদীর স্রোতে নিক্ষেপ করেন। সবার কলম নদীর স্রোতে ভেসে যায়। শুধু হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর কলম স্রোতের বিপরীতে স্থির থাকে এবং তিনি লটারিতে বিজয়ী হয়ে হজরত মারইয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন তিনি। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে কলম দ্বারা তাওরাত লেখার কলম উদ্দেশ্য। (তাফসীরে আনওয়ারুল কোরআন, মাওলানা আবুল কালাম মাসুম, ইসলামিয়া কুতুবখানা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৫৭)
ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক লটারির বিধান হলো, ‘হানাফি মাজহাব মতে যেসব হকের কারণ শরিয়ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট ও জানা আছে; সেসব হকের মীমাংসা লটারিযোগে করা নাজায়েজ এবং তা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণত, শরিকানাধীন বস্তুর মীমাংসা লটারিযোগে করা এবং লটারিতে যার নাম বের হবে তাকে সম্পূর্ণ বস্তুটি দিয়ে দেওয়া অথবা কোনো শিশুর পিতৃত্বে মতবিরোধ দেখা দিলে লটারি যোগে একজনকে পিতা মনে করে নেওয়া নাজায়েজ।
পক্ষান্তরে যেসব হকের কারণ জনগণের রায়ের ওপর ন্যস্ত; সেসব হকের মীমাংসা লটারি যোগে করা জায়েজ। উদাহরণত, কোন শরিককে কোন অংশ দেওয়া হবে; এ বিষয়টি লটারির মাধ্যমে মীমাংসা করা যাবে। এক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে একজনকে পূর্বের অংশ এবং অন্যজনকে পশ্চিমের অংশ দেওয়া জায়েজ। কারণ এভাবে লটারি করা ছাড়াও উভয়পক্ষ একমত হয়ে যদি এভাবে অংশ নিত অথবা বিচারের রায়ের ভিত্তিতে এভাবে নিত তবুও তা জায়েজ হতো। (তাফসীরে মারেফুল কোরআন, মুফতি মোহাম্মদ শফী, অনুবাদ ও সম্পাদনা : মাওলানা মহিউদ্দিন খান, পৃষ্ঠা : ১৭৫)
হজরত মারইয়াম (আ.)-এর তত্ত্বাবধানের বিষয়টি প্রয়োজনও ছিল, কারণ তিনি ছিলেন এতিম। পিতার ইনতিকালের পর কোনো পুরুষ অভিভাবক ছিল না তার। অনেক ইতিহাসবিদ বলেছেন, ‘সেসময় একটি দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটেছিল। যার ফলে মারইয়ামের লালন-পালনের ভার কারও না করো গ্রহণ করা জরুরি ছিল।’ আবার কিছু ইতিহাসবিদ বলেছেন, ‘মারইয়াম (আ.) তার মায়ের মান্নত অনুযায়ী উপাসনাগৃহের জন্য উৎসর্গিত ছিলেন। তবে তিনি তখনো বালিকা হওয়ার কারণে কোনো সৎ লোকের তত্ত্বাবধানে থাকাটা জরুরি ছিল। (তাফসিরে রুহুল মাআনি, সুরা আলে ইমরানের ৩৬ নং আয়াতের তাফসির দ্রষ্টব্য; তাফসিরে তরজুমানুল কুরআন, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৪৩)
হজরত জাকারিয়া (আ.) হজরত মারইয়াম (আ.)-এর জন্য পবিত্র উপাসনাগৃহের পাশেই একটি কক্ষ নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দিনের বেলায় আল্লাহতায়লার ইবাদতে মশগুল থাকতেন আর রাতে খালার কাছে চলে যেতেন এবং সেখানে রাত্রিযাপন করতেন। (কসাসুল কুরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান সওহারবি, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, মাকতাবাতুল ইসলাম, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ১৩-১৪)
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক