পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে তোমরা আহার করো। আর পুনরুত্থান তো তাঁরই কাছে।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১৫)
রিজিক অন্বেষণের প্রয়োজনে মানুষকে কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন পেশার সঙ্গে জড়াতে হয়। ইসলাম বেশির ভাগ কাজ ও পেশা বৈধ করেছে। তবে এমন কিছু পেশা ও শিল্পকর্ম রয়েছে, যেগুলো ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ। কারণ এতে ইসলামি সমাজের আকিদা-বিশ্বাস, চারিত্রিক পবিত্রতা ও মান-সম্মানের ঘাটতি হয়। এখানে সম্পূর্ণ হারাম; এমন কয়েকটি পেশার পরিচয় তুলে ধরা হলো—
পতিতাবৃত্তি: ইসলামে পতিতাবৃত্তির পেশাটি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত, হারাম। কোনো স্বাধীন নারী কিংবা দাসীর জন্য ব্যভিচারের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জনের অনুমতি ইসলাম কখনোই দেয় না। পাশ্চাত্যের অধিকাংশ রাষ্ট্রে পতিতাবৃত্তি একটি বৈধ পেশা। এর জন্য তারা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রেখেছে। এই জঘন্য কাজটিকে তারা অন্য দশটি পেশার মতোই দেখে। জাবের (রা.) বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলের দুজন দাসী ছিল, একজনের নাম মুসাইকা এবং আরেকজনের নাম উমাইমা। সে তাদের দুজনকে দিয়ে জোরপূর্বক বেশ্যাবৃত্তি করাত। তাই তারা এ বিষয়ে নবিজি (সা.)-এর কাছে অভিযোগ দায়ের করল। তখন আল্লাহতায়ালা এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন, ‘আর তোমাদের দাসীরা সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে পার্থিব জীবনের ধন-সম্পদের লালসায় তাদের ব্যভিচারে লিপ্ত হতে বাধ্য করো না। এই নিষেধাজ্ঞার পরও কেউ তাদের বাধ্য করলে, তাদের (দাসীদের) ওপর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩৩; মুসলিম, হাদিস: ৩০২৯)
এই হাদিসের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই নিকৃষ্ট পেশার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। প্রয়োজন যতই তীব্র হোক ব্যভিচার কখনোই বৈধ হতে পারে না।
অশ্লীল শিল্পকর্ম: যৌন আবেদনময় নৃত্য, অশ্লীল গান, নগ্ন অভিনয় এবং এ ধরনের সব অশ্লীল কর্ম হারাম। নিষিদ্ধ সম্পর্কের পথ খুলে দেয় এ জাতীয় প্রতিটি কথা, কাজ ও পদক্ষেপ ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথা।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩২)
আল্লাহতায়ালা শুধু ব্যভিচারকে নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তিনি এর ধারে-কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন।
চিত্রশিল্পী, ক্রুশ ও ভাস্কর্য নির্মাণ করা: ইসলামে দেহবিশিষ্ট মূর্তি ও প্রতিকৃতি তৈরি করা হারাম। এগুলো সংরক্ষণও নিষিদ্ধ। ইমাম বুখারি (রহ.) সাইদ ইবনে আবিল হাসান (রহ.) সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় তার কাছে এক ব্যক্তি এসে (তার উপনাম ধরে ডেকে) বলল, হে আবু আব্বাস, আমি এমন এক মানুষ, আমার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম আমার হস্তশিল্প। আর আমি (এ হস্তশিল্পের মাধ্যমে প্রাণীর) এসব ছবি প্রতিকৃতি নির্মাণ করি। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, (প্রাণীর এসব ছবি-প্রতিকৃতি নির্মাণের বিষয়ে) আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে যা বলতে শুনেছি, শুধু তা-ই তোমাকে বর্ণনা করব। আমি তাকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো (প্রাণীর) ছবি-প্রতিকৃতি নির্মাণ করে আল্লাহতায়ালা তাকে শাস্তি দেবেন, যতক্ষণ না সে তাতে প্রাণ সঞ্চার করে। আর সে তাতে কখনো প্রাণ সঞ্চার করতে পারবে না। এতে লোকটি ভীষণভাবে ভয় পেয়ে গেল এবং তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, আফসোস তোমার জন্য। তুমি যদি একান্ত এ কাজ না-ই ছাড়তে পারো, তবে এ গাছপালা ও প্রত্যেক প্রাণহীন বস্তুর ছবি-প্রতিকৃতি বানাতে পারো।’ (বুখারি, হাদিস: ২২২৫)
মদ: মদ তথা নেশা উদ্রেককারী সব দ্রব্য প্রস্তুতকরণ, বণ্টন ও সেবন সবকিছু ইসলামে হারাম। যারা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাদের সবার প্রতি নবিজি (সা.) অভিসম্পাত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মদের ওপর দশভাবে অভিসম্পাত করা হয়েছে। যথা—মদ, মদ উৎপাদক, মদ উৎপাদনের নির্দেশদাতা, মদ বিক্রেতা, মদের ক্রেতা, মদ বহনকারী, যার জন্য মদ বহন করা হয়, মদের মূল্য ভোগকারী, মদ পানকারী ও মদ পরিবেশনকারী (এদের সবাই অভিশপ্ত)।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২৯৫, ইবনে মাজাহ: ৩৩৮০)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক