সুরা কাহাফ মক্কায় অবতীর্ণ। কোরআনের ১৮তম সুরা এটি। এর আয়াত সংখ্যা ১১০। কাহাফ অর্থ গুহা। সুরায় গুহাবাসী সাত তরুণের গল্প রয়েছে। ৯ থেকে ২৬ নং আয়াতে তাদের ঈমান আনা, ঈমান বাঁচাতে শহর ত্যাগ এবং গুহায় আশ্রয়ের বিবরণ রয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিয়ে বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তোমার কাছ থেকে আমাদের রহমত দান কর আর আমাদের ব্যাপারটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করো। অতঃপর আমি তাদের গুহায় ঘুমন্ত অবস্থায় কয়েক বছর রেখে দিলাম।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ১০-১১)
ঘটনাটি কখন ঘটেছিল—এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কেউ বলেছেন, ‘ঈসা (আ.)-এর ঊর্ধ্বগমনের পরে অর্থাৎ প্রথম থেকে তৃতীয় খ্রিষ্ট শতাব্দীকালের মধ্যেই ঘটেছিল।’
গুহাটির অবস্থান নিয়ে কোরআনে স্পষ্ট বিবরণ নেই। এর সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা অসম্ভব। ইবনে আতিয়ার এক বর্ণনা মতে, এটি সিরিয়ায়। অন্য একটি বর্ণনা মতে, স্পেনের গ্রানাডায়। ইবনে কাসির (রহ.) দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইমাম কুরতুবিসহ অন্যান্য প্রায় সব তাফসিরকারকের মতে এটি আফসুস, তথা তরসুস শহরে—যা এশিয়া মহাদেশের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন: ৭৯৯)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আসহাবে কাহাফের গুহা আয়লা (আকাবা উপসাগর)-এর কাছে (অর্থাৎ জর্দানে) অবস্থিত।’ (তাফসিরে তাবারি: খণ্ড: ১৭, পৃষ্ঠা: ৬০২) বেশ কিছু লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে যুগের অনেক গবেষক গুহাটি জর্দানে হওয়ার মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
তখন সমাজ ছিল অবিশ্বাসে ভরা। সবাই ছিল মুশরিক। কারও মধ্যে একাত্মবাদের বিশ্বাস ছিল না। বাদশাহও ছিলেন মূর্তিপূজক। সেসময় সাত যুবক মূর্তিপূজার বিষয়টি মানতে পারছিলেন না। কল্পিত উপাসকের উপাসনা তাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। পাথরের মূর্তিকে খোদা মানতে তাদের চিন্তা বাধা দিয়েছিল। তারা পৃথিবীর সৃষ্টি, আকাশের সৌন্দর্য, বাতাসের গতিবেগ, জীবন-মরণের রহস্য দেখে আসল সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজছিলেন। তারা পরস্পরে মূর্তিপূজা ও শিরকের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করছিলেন। এক দিন তাদের অন্তর তাওহিদের (আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস) আলোয় আলোকিত হলো।
তারপর তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিলেন। বাদশাহ তাদের ডেকে পাঠালেন। চাউর হওয়া বিষয়টি জিজ্ঞেস করেন। যুবকরা নির্ভয়ে ও সাহসের সঙ্গে আল্লাহর বাণী উচ্চারণ করেন। বাদশাহ ব্যাপারটি অপছন্দ করেন। তারপরও তিনি পুনর্বিবেচনার জন্য যুবকদের কিছুদিনের অবকাশ দেন। যুবকরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন, কোনো পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপনে থাকা উচিত। (কাসাসুল কোরআন, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ২২)
বাদশাহ খবর জানতে পেরে তাদের হত্যার ঘোষণা দেন। ফলে ঈমান রক্ষার জন্য তারা বেরিয়ে পড়েন। পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। তাদের সঙ্গে একটি কুকুরও ছিল। কুকুরের নাম ছিল কিতমির। কিতমির গুহামুখে বসে তাদের পাহারা দিল। বাদশাহর বাহিনী তাদের খুঁজে পেল না।
গুহার অভ্যন্তর ছিল বেশ প্রশস্ত। সেখানে জীবন রক্ষার প্রাকৃতিক সব উপকরণ ছিল। একদিকে গুহার মুখ, অপর দিকে বায়ু চলাচলের পথ। এর মাধ্যমে সব সময় সতেজ বায়ু ভেতরে প্রবেশ করে এবং বেরিয়ে যায়। গুহাটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে অবস্থিত। ফলে সূর্যের উদয়াস্তের সময় তার আলো ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না; কিন্তু মৃদু ও হালকা আলো সব সময়ই পৌঁছতে পারে। সেখানে মৃদু আলোর আলোড়ন ছিল। (কাসাসুল কোরআন, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ২২-২৩)
গুহায় আল্লাহতায়ালা আসহাবে কাহফের সদস্যদের ঘুম পাড়িয়ে দেন। সেই ঘুম ৩০৯ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। ঘুম ভাঙার পর তাদের একজন খাদ্য সংগ্রহের জন্য শহরে এলে লোকজন তাকে চিনে ফেলে। তিনি ভেবেছিলেন কেউ চিনবে না। এর মধ্যে এত পরিবর্তন দেখে তিনি আশ্চর্য হন। এদিকে জালিম বাদশাহও ততদিনে মারা গেছে। তাদের ওপর দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে তিন তিনটি শতক। বর্তমান বাদশাহ আসমানি ধর্মে বিশ্বাসী।
লোকেরা তাকে দেখে বিস্মিত হয়ে নানা কথা বলছিলেন। তিনি গুহায় সঙ্গীদের কথা বলে দ্রুত কেটে পড়েন। গুহায় ফিরে তাদের বিস্তারিত কাহিনি শোনান। এদিকে বর্তমান বাদশাহ খবর পেয়ে দলবল নিয়ে সেখানে যান এবং দেখেন গুহার ভেতর সবাই মারা গেছেন। বাদশাহ সেই গুহামুখে তাদের স্মরণে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক