আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে নিরাপদ খাদ্যের সন্ধান পাওয়া মুশকিলের ব্যাপার। এখন খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, সংরক্ষণ থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণের প্রত্যেকটি ধাপেই খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। ফরমালিন, কার্বাইড ও কাপড়ের রঙ খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব বিষযুক্ত খাবার খেয়ে মানুষ নানা জটিল রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষিত খাবার মানবদেহে প্রায় ২শর বেশি রোগের সৃষ্টি করে, যার মধ্যে ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিস, স্ট্রোক বা উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, ক্যানসার, কিডনি রোগসহ প্রায় ৪১ শতাংশ অসুস্থতা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। এ কারণে প্রতি বছর মারা যায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এ ছাড়া ৫ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুদের ৪৩ শতাংশই খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রাণ হারায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু। শুধু বৈশ্বিকভাবেই নয়, সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। সুস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে ইসলামের রয়েছে কালজয়ী বিধান। ইসলাম সর্বদা তাত্ত্বিক ও নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে মানবজীবনের সমস্যাসমূহের সমাধান পেশ করে। পবিত্রতা, ইনসাফ, ন্যায়বিচার, হালাল, হারাম—এসব ইসলামের মৌলিক বিধান। জীবনের সর্বত্র এর প্রভাব ও কার্যকারিতা বিদ্যমান। নিরাপদ খাদ্য ও সুস্বাস্থ্য রক্ষায় ইসলামের এসব বিধানের কার্যকারিতা সমভাবে ক্রিয়াশীল।
খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ফসল উৎপন্ন ও সংরক্ষণ করতে হবে। নিরাপদ খাদ্যের জন্য খাদ্য উৎপাদনের বিকল্প নেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা যে বীজ বপন করো, তা সম্পর্কে ভেবে দেখছ কী? তোমরা সেটা উৎপন্ন করো, নাকি আমি উৎপন্নকারী? আমি ইচ্ছে করলে সেটা খড়কুটায় পরিণত করে দিতে পারি। (তা করলে) তখন তোমরা অবাক হয়ে যাবে।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৬৩-৬৫)
পবিত্র জীবনের জন্য পবিত্র খাবার : জীবনের সব ক্ষেত্রে পবিত্রতা রক্ষা এবং হালাল খাদ্য গ্রহণ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এ দুটি উপাদানের মধ্যে নিহিত রয়েছে সুস্থ দেহ ও সুন্দর জীবনের পরীক্ষিত সমাধান। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা হালাল ও উত্তম রিজিক আহার করো, যা আমি তোমাদের দিয়েছি।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭২) ইসলামে নোংরা অপবিত্র বস্তু খাওয়া হারাম। এমনকি যে প্রাণীতে হারামের কোনো চিহ্ন পাওয়া যাবে, তাও নিষেধ। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন রক্ত, শূকরের মাংস এবং যা জবাইকালে আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়েছে। অতপর কেউ সীমা লঙ্ঘনকারী না হয়ে নিরুপায় হয়ে পড়লে। তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১১৫) এ ছাড়াও প্রবাহিত রক্ত এবং যেসব খাবারে কোনো প্রকার উপকার নেই যেমন—বিষ, মদ, খড়কুটা, মাদকদ্রব্য, তামাক, ধূমপান ও অন্যান্য নেশজাতীয় দ্রব্যও গ্রহণ করা হারাম।
অপচয়-অপব্যবহার নিষেধ : ইসলামে দেহের প্রয়োজন অনুপাতে খাবার গ্রহণ করা জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম নীতিও এটি। খাবারের অপচয় ও অপব্যবহার নিষেধ করেছে ইসলাম। অপচয়ের মাধ্যমে জীবনে অধঃপতন নেমে আসে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা খাও এবং পান করো, অপচয় করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩০)
খাদ্যে ভেজাল মেশানো পাপ : খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো, পণ্যের ত্রুটি গোপন করা, ভালো পণ্যের সঙ্গে খারাপ বা নিম্নমানের পণ্য মিশ্রিত করা, দুধের সঙ্গে পানি মেশানো, জাল মুদ্রার প্রচলন ঘটানো, ওজনে কম দেওয়া, পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদান, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি করা, মিথ্যা বিজ্ঞাপন প্রচার—এগুলো সবই প্রতারণা ও গুনাহের কাজ। ইসলামে এ জাতীয় সবকিছু সম্পূর্ণ নিষেধ ও হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না এবং কারও ক্ষতি করো না।’ (তুহফাতুল আওজায়ি: ৫/৪৩৭)
খাদ্যে ভেজালকারীদের প্রতি নবিজির সতর্কবার্তা : আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার খাদ্যের স্তূপের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ভেজা অনুভব করলেন। খাদ্যের মালিকের কাছে কারণ জানতে চাইলে সে বলল, ‘বৃষ্টির পানি লেগেছে।’ নবি (সা.) বললেন, ‘ভেজাগুলো ওপরে রাখতে পারলে না, যাতে মানুষ ধোঁকা না খায়? যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মত নয়।” (মুসলিম, হাদিস : ১০২)
খাদ্যে ধোঁকা দেওয়া হারাম : আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি মহানবি (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলেন—তাকে ক্রয়-বিক্রয়ে ধোঁকা দেওয়া হয়। তখন তিনি বললেন, যখন তুমি ক্রয়-বিক্রয় করবে তখন বলে নেবে, কোনো প্রকার ধোঁকা ও প্রতারণা করা যাবে না।” (মুসলিম, হাদিস: ২০২০)
সুন্নাহর অনুসরণ : মহানবি (সা.)-এর জীবনে রয়েছে মানবজাতির সর্বোত্তম আদর্শ। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান সুস্থ ও সুন্দর জীবনের যেসব নির্দেশনা দিচ্ছে, দেড় হাজার বছর আগেই বিশ্বনবি (সা.) মানবজাতির জন্য তার চেয়ে উত্তম আদর্শ রেখে গেছেন। ইসলামে নবির নির্দেশিত খাবার গ্রহণের পন্থা একজন মানুষের সুস্থ, সবল থাকার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। খাবার নির্বাচন ও গ্রহণে নবিজি (সা.)-এর যেসব সুন্নত রয়েছে, তা সুস্থতা ও নিরাপদ খাদ্যের জন্য সর্বাধিক উপযোগী ও কল্যাণকর।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ