আজ খতমে তারাবিতে সুরা বাকারার ২০৪ থেকে সুরা আলে ইমরানের ৯১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে। দ্বিতীয় পারার দ্বিতীয় অর্ধেক ও তৃতীয় পারার পুরো অংশ—মোট দেড় পারার এই অংশে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনা স্থান পেয়েছে। মদ-জুয়া, সুদ, স্ত্রীর অধিকার, ইসা (আ.)-এর জন্ম, রাত-দিনের বিবর্তন, জীবন-মৃত্যুর রহস্য, মাতৃগর্ভে মানুষের আকার-আকৃতিসহ অনেক কথা এখানে বিবৃত হয়েছে।
ঋতুস্রাব চলাকালে স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশার বিধান
সুরা বাকারার ২২২ থেকে ২২৩ নম্বর আয়াতে ঋতুস্রাব চলাকালে স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশার বিধানের কথা সুস্পষ্ট বলে দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা। ঋতুস্রাব চলাকালে স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা জায়েজ নেই। ঋতুস্রাবের নাপাকিতে জীবাণু লুক্কায়িত থাকে। যার ফলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। অবশ্য অন্যান্য পারিপার্শ্বিক মেলামেশা, একসঙ্গে থাকা ও খাওয়া-দাওয়ায় কোনো সমস্যা নেই।
স্ত্রীর সম্মান ও অধিকার
সুরা বাকারার ২২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা নারী অধিকারের মূলনীতি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন। ইসলাম-পূর্বকালে পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই স্ত্রীর অধিকার স্বীকৃত ছিল না। নারীকে স্বাধীন ভাবা হতো না। তাদের যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। মানবসভ্যতা সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত স্ত্রীর অধিকার হরণের এ গুরুতর পাপে নিমজ্জিত ছিল। ইসলাম সব ধরনের প্রান্তিকতামুক্ত বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি ত্যাগ করে মধ্যমপন্থা নির্দেশ করেছে। ইসলাম স্ত্রীকে অধিকারহীন করেনি, আবার সব বিষয়ে স্বামীর সমান করেনি। সংসার-জীবনে স্ত্রীরও কিছু অধিকার আছে স্বামীর ওপর, আবার স্বামীরও কিছু অধিকার আছে স্ত্রীর ওপর। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কিছু কর্তব্য আছে, আবার স্বামীর প্রতি স্ত্রীরও কিছু কর্তব্য আছে। সম্মান উভয়ের আছে। আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে স্ত্রীর অধিকারের কথা আগে বলেছেন। বর্ণনা ধারার মাধ্যমে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, স্ত্রীর অধিকারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সুদ হারাম
এ সুরার ২৭৮ ও ২৭৯ নম্বর আয়াতে সুদ ও সুদখোর সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামে সুদ হারাম। সুদখোরকে জিন ও শয়তানের প্রভাবে পাগলপ্রায় লোকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দুনিয়াতেও সুদখোর পাগলের মতো থাকবে। কিয়ামতের দিনও কবর থেকে পাগলের মতো উত্থিত হবে। যারা সুদ থেকে বিরত হয় না, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকার মতো ভয়াবহ পাপে লিপ্ত থাকে।
মৃতকে জীবিত করার ঘটনা
এ সুরার পাঁচ জায়গায় মৃতকে জীবিত করার বিবরণ পাওয়া যায়। যেমন—এক. বনি ইসরাইলের এক মৃত ব্যক্তির শরীরে গাভীর গোশত লাগানোর পরপরই তার জীবিত হয়ে যাওয়া। দুই. বনি ইসরাইলের যে অস্বীকারকারীরা আল্লাহতায়ালাকে দেখতে চেয়েছিল। তিন. যে সম্প্রদায় মহামারি থেকে বাঁচতে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। চার. উজাইর (আ.)-এর ঘটনা। পাঁচ. ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনা।
ইমরানপরিবারের গল্প আছে সুরা আলে ইমরান
কোরআনের তৃতীয় সুরা আলে ইমরান মদিনায় অবতীর্ণ। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ২০০। আলে ইমরান অর্থ ইমরানের পরিবার। ইমরান (আ.)-এর বংশধর সম্পর্কে এ সুরায় আলোচনা থাকার কারণে এর নামকরণ করা হয় আলে ইমরান।
মরিয়াম ও ইসা (আ.)-এর ঘটনা
সুরা আলে ইমরানের ৩০-৬২ নম্বর আয়াতে ইমরান (আ.)-এর বংশধর, বৃদ্ধ বয়সে জাকারিয়া (আ.)-এর সন্তান লাভ, ইসা (আ.)-এর মা মরিয়াম (আ.)-এর জন্ম, মরিয়াম (আ.)-এর বায়তুল মুকাদ্দাসের সেবক হওয়া, পরে কুমারী অবস্থায় আল্লাহর আদেশে গর্ভবতী হওয়া, ইসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম, বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ, দোলনায় ইসা (আ.)-এর কথোপকথন, তাকে জীবিত অবস্থায় আসমানে তুলে নেওয়া ও বনি ইসরাইলের প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আছে সওয়াব
প্রত্যেক মানুষ তার প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তার প্রতিশ্রুতির সঠিক জবাব না দিয়ে পরপারে কেউ মুক্তি পাবে না। প্রতিশ্রুতি পালনে আছে সফলতা। প্রতিশ্রুতি পালনে রয়েছে প্রভুর সন্তুষ্টি। এবং জীবনের গলিতে পবিত্রতার ছাপ। প্রতিশ্রুতি পালন করা হলো মুমিনের নিদর্শন। যে প্রতিশ্রুতি পালন করে না সে মুনাফিক। আল্লাহ বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই যে নিজ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে। তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ মহান মুত্তকিনদেরকে ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭২)
এ ছাড়া সুরায় তালুত (আ.) ও জালুতের যুদ্ধের কাহিনি, সুদ হারাম, ঋণ দেওয়ার পদ্ধতি, সব নবি-রাসুল এক আল্লাহর দাওয়াত দিয়েছেন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বিবরণ রয়েছে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক