আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৮৩ থেকে সুরা আরাফের ১১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত; মোট দেড় পারা তেলাওয়াত করা হবে। পারা হিসেবে সপ্তম পারা এবং অষ্টম পারার প্রথমার্ধের এই অংশে সত্যানুরাগীদের প্রশংসা, হালাল খাবারের গুরুত্ব, শপথ ভাঙার কাফফারা, ভ্রমণ, অসিয়ত, পৃথিবী সৃষ্টি ও ইসা (আ.)-এর অলৌকিক ঘটনা, অহেতুক প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশসহ নানা বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে।
কসমের বিধান
কসম মুখের কাজ; শুধু মনের কাজ নয়। তাই কেউ কোনো কিছুর ইচ্ছা করে মুখে উচ্চারণ করার আগ পর্যন্ত কসম সংঘটিত হবে না। কসমকারী অতীত বা বর্তমানকালের কোনো একটি বিষয়ে নিজের ধারণা অনুযায়ী সত্য মনে করে কসম করা অথচ বিষয়টি বাস্তবে তার ধারণামাফিক নয়; এ জাতীয় কসমের কোনো শাস্তি নেই, তবে গুনাহ আছে। আর যে কসম ভবিষ্যৎ-সম্পর্কিত এবং তা পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি, ওই কসম করলে কাফফারা দিতে হবে, না দিলে গুনাহগার হবে। কসমের কাফফারা হলো, ১০ মিসকিনকে দু-বেলা তৃপ্তিসহকারে খাবার খাওয়ানো অথবা তাদের এক জোড়া করে কাপড় দেওয়া। অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে কাফফারা আদায়ে সামর্থ্য না থাকলে লাগাতার তিনটি রোজা রাখা। প্রকাশ থাকে যে, কসম একমাত্র আল্লাহতায়ালার নামেই করা যায়। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে কসম করা নাজায়েজ।
সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য অসিয়ত করা
মৃত্যুর পর পালনীয় ও করণীয় সম্পর্কে জীবিত থাকা অবস্থায় উত্তরসূরিদের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে যাওয়াকে ‘অসিয়ত’ বলে। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত অসিয়ত। সবারই উচিত, সব সময় অধীনস্থদের অসিয়ত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিমের অসিয়ত করার মতো কোনো বিষয় রয়েছে, অসিয়ত অলিখিত অবস্থায় দুই রাতও অতিবাহিত করা তার উচিত নয়।’ (বুখারি, হাদিস : ২৭৩৮)
অসিয়ত স্বেচ্ছায় হতে হবে। এর জন্য বলপ্রয়োগ করা যাবে না। অসিয়ত হতে হবে ব্যক্তির পার্থিব উপার্জন থেকে। কাউকে ঠকানো বা ওয়ারিশদের হক কম দেওয়া কিংবা তাদের বঞ্চিত করার জন্য অসিয়ত করা কবিরা গুনাহ।
সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ অসিয়ত করা যাবে। এর চেয়ে বেশি করা জায়েজ নয়। মৃত্যুর পর ঋণ পরিশোধ, দাফন-কাফন, জানাজার নামাজ পড়ানো, সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা, মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ ও জনকল্যাণমূলক যেকোনো কাজের বিষয়ে অসিয়ত হতে পারে। অসিয়ত করার সময় দুজন সাক্ষী রাখা জরুরি। যেন পরে এ নিয়ে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও মতানৈক্য সৃষ্টি না হয়। আল্লাহতাআলা বলেন, ‘হে মুমিনেরা, যখন তোমাদের কারও কাছে মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন অসিয়তকালে তোমাদের মধ্য থেকে দুজন (ন্যায়পরায়ণ) ব্যক্তি সাক্ষী হবে।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ১০৬)
জীবজন্তুর নামে যে সুরার নাম
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা আনয়ামের আয়াত সংখ্যা ১৬৫। কোরআনের ষষ্ঠ সুরা এটি। আনয়াম অর্থ জীবজন্তু। এ সুরায় বিভিন্ন প্রাণী সম্পর্কে আলোচনা থাকায় এর নাম রাখা হয়েছে সুরা আনয়াম।
ভ্রমণ ইবাদত
পবিত্র কোরআনে ১৩ বারের বেশি ভ্রমণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সুরা আনয়ামের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মানুষকে ভ্রমণের নির্দেশ দিয়েছেন। পৃথিবীর দিক-দিগন্তে কত দেশ, নগর, সভ্যতা ও কত রং-বেরঙের মানুষ আছে—তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কত বৈচিত্র্য, কত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে বিশ্বের অলি-গলি আর পাড়া-মহল্লায়, তা দেখে বিমোহিত হয় না এমন মানুষ মেলা ভার। দুনিয়ায় আল্লাহর এই সৃষ্টি, সৌন্দর্যের বিপুল আয়োজন, ভাঙা-গড়ার খেলা—এসব থেকে জীবনের জন্য শিক্ষা নিতে হবে।
ভ্রমণ মানুষের চোখ খুলে দেয়। মন পরিতৃপ্ত করে। জ্ঞান বৃদ্ধি করে। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে। বন্ধুকে চিনতে সহযোগিতা করে। আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় মেলে। সৃষ্টিজীবের বৈচিত্র্য আর পৃথিবীর আশ্চর্য সুনিপুণ সৌন্দর্য দেখে মাথা নত হয়ে যায় প্রভুর কাছে। আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী শক্তিশালী মানুষ ও সভ্যতার ধ্বংস দেখে ঈমান সতেজ-সবুজ হয়। এসব কারণে ভ্রমণকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়।
জীবন-মরণ আল্লাহর জন্য
আল্লাহ মানুষ ও জিন জাতিকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ নবি ইবরাহিম (আ.)-কে জীবনের উদ্দেশ্য শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন, ‘বলো, আমার নামাজ, আমার যাবতীয় ইবাদত, আমার জীবন, আমার মরণ (সবকিছুই) বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই (নিবেদিত)।’ (সুরা আনয়াম, আয়াত : ১৬২)
তাই মুসলমানদের মনে রাখতে হবে, আমি আল্লাহর জন্য। আমার সবকিছু আল্লাহর জন্য নিবেদিত। আমার হাঁটা-চলা, খাবার গ্রহণ, নির্জনতা, সংসার—সবকিছু আল্লাহর জন্য। প্রতিটি কাজ করার সময় খেয়াল রাখতে হবে, এই কাজ আল্লাহর জন্য কি না।
এ ছাড়া দুনিয়া-আখেরাতের জীবন, কোরআন নাজিলের প্রয়োজনীয়তা, কাফেরদের শাস্তি, মানুষ সৃষ্টির ইতিহাস, প্রতিশ্রুতি পালন, আল্লাহর নামে পশু কোরবানি ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক