আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের সুরা ইসরা ও সুরা কাহফের ১ থেকে ৭৪ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে। পারা হিসেবে ১৫তম পারা। এই অংশে নবি (সা.)-এর মেরাজ, আল্লাহ ও বান্দার হক, মা-বাবার প্রতি সদাচার, আসহাবে কাহফের ঘটনা, কোরআনের বৈশিষ্ট্য, আল্লাহর সুন্দর নাম, বান্দার ডাকে আল্লাহর সাড়া, মিতব্যয়িতা, ব্যভিচারের শাস্তি ও নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়সহ নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মেরাজ
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা ইসরার আয়াত সংখ্যা ১১১। পবিত্র কোরআনের ১৭তম সুরা এটি। ইসরা অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মেরাজ রাতে হয়েছিল, তাই এটিকে ইসরা বলা হয়। বিশেষত বায়তুল্লাহ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফরকে ইসরা বলা হয়। এই সুরায় এ ঘটনার আলাপ থাকায় এ সুরাকে ইসরা বলা হয়। এ সুরায় বনি ইসরাইলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ থাকায় সুরা বনি ইসরাইলও বলা হয়।
ঊর্ধ্বজগৎ ভ্রমণে রাসুলুল্লাহ (সা.)
সুরা বনি ইসরাইলের শুরুতেই আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঊর্ধ্বজগৎ ভ্রমণের কথা তুলে ধরেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন মক্কায়। রাতের বেলা শুয়ে আছেন। জিবরাইল ও মিকাইল (আ.) তাঁর কাছে এলেন। এর মধ্যে জমজমের পানি দিয়ে তাঁর বুক চিড়ে পবিত্র করা করলেন। জিবরাইল-মিকাইল তাঁকে নিয়ে চললেন মেরাজের পথে। মেরাজ অর্থ ঊর্ধ্বগমন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সশরীরে সজ্ঞানে জাগ্রত অবস্থায় জিবরাইল ও মিকাইলের (আ.) সঙ্গে বিশেষ বাহন বোরাকে করে রাতে ভ্রমণ করেন। তিনি মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় যান। সেখানে তিনি সব নবি-রাসুলকে নিয়ে দুই রাকাত নামাজে ইমামতি করেন। জিবরাইল তাঁর সামনে দুধ ও শরাবের পেয়ালা ধরলে তিনি দুধের পেয়ালা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি প্রথম আসমান হয়ে ধারাবাহিকভাবে সপ্তম আসমান অতিক্রম করেন। সেখানে আসমানের ফেরেশতারা তাঁকে সম্ভাষণ জানান। সাত আসমানে সাতজন নবির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁর। পরে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত এবং সেখান থেকে একাকী রফরফ বাহনে আরশে আজিম পর্যন্ত ভ্রমণ করে মহান রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করেন। পাশাপাশি জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন করে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। উম্মতের জন্য নিয়ে আসেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ।
পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচার
মা-বাবা নির্ভয় ও নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। তাদের কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে সন্তান বেড়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে সদাচার করা ইবাদত। তাদের মুখে হাসি ফোটানো সওয়াবের কাজ। তাদের কষ্ট দেওয়া গুনাহ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের (বিরক্তিসূচক) ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো। তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও এবং বলো— হে আমার প্রতিপালক, তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমনভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবে লালনপালন করেছেন।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৩)
অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই
অর্থসম্পদ মহান আল্লাহর নেয়ামত। এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা মুমিনের গুণ। অর্থের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনমাফিক খরচ করতে হবে। অপচয় ও কৃপণতা করা যাবে না। অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭)
ঘটনার সুরা—সুরা কাহাফ
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা কাহাফের আয়াত সংখ্যা ১১০। কোরআনের ১৮তম সুরা এটি। কাহাফ অর্থ গুহা। সুরায় গুহাবাসীর কাহিনির বর্ণনা থাকায় এর নাম রাখা হয়েছে কাহফ। এ সুরায় বেশ কয়েকটি ঘটনার বিবরণ রয়েছে। যথা—
১.সাত তরুণের গুহাবাসী হওয়ার ঘটনা
২. বাগানের মালিকের বিশ্বাসের ঘটনা
৩. মুসা ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা
৪. বাদশাহ জুলকারনাইনের ঘটনা
ঈমান বাঁচাতে সাত তরুণের গুহায় আশ্রয়
সুরা কাহফের ৯ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে আসহাবে কাহফ তথা গুহাবাসীর ঘটনার বিবরণ রয়েছে। তখন সমাজ ছিল অবিশ্বাসে ভরা। কারও মধ্যে একত্ববাদের বিশ্বাস ছিল না। বাদশাহ ছিলেন মূর্তিপূজক। সে সময় সাতজন যুবক আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছিলেন। তারা গোপনে ইবাদত করতেন। বাদশাহর কাছে একদিন বিষয়টি ধরা পড়লে তিনি তাদের হত্যার ঘোষণা দেন। ফলে ইমান রক্ষার জন্য তারা বেরিয়ে পড়েন। একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। তাদের সঙ্গে একটি কুকুরও ছিল। কুকুরের নাম ছিল কিতমির। কিতমির গুহামুখে বসে তাদের পাহারা দিল। বাদশাহর বাহিনী তাদের খুঁজে পেল না। গুহায় আল্লাহতায়ালা আসহাবে কাহফের সদস্যদের ঘুম পাড়িয়ে দেন। সেই ঘুম ৩০৯ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। ঘুম ভাঙার পর তাদের একজন খাদ্য সংগ্রহের জন্য শহরে এলে লোকজন তাঁকে চিনে ফেলে। তিনি ভেবেছিলেন কেউ চিনবে না। এর মধ্যে এত পরিবর্তন দেখে তিনি আশ্চর্য হন। এদিকে জালিম বাদশাহও তত দিনে মারা গেছেন। তাদের ওপর দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে তিন তিনটি শতক। বর্তমান বাদশাহ আসমানি ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। লোকেরা তাকে দেখে বিস্মিত হয়ে নানা কথা বলছিলেন। তিনি গুহায় সঙ্গীদের কথা বলে দ্রুত কেটে পড়েন। গুহায় ফিরে তাদের বিস্তারিত কাহিনি শোনান। এদিকে বর্তমান বাদশাহ খবর পেয়ে দলবল নিয়ে সেখানে যান এবং দেখেন গুহার ভেতর সবাই মারা গেছেন। বাদশাহ সেই গুহামুখে তাদের স্মরণে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।
এ ছাড়া তারাবির আজকের অংশে ফেতনা-বিপর্যয় সৃষ্টির কারণে শাস্তি, সামাজিক জীবনে শিষ্টাচার, মানুষের তাড়াহুড়া, নবিজির প্রতি তাহাজ্জুদের নির্দেশ, আল্লাহর সামনে যুক্তিতর্ক নিষেধ, প্রাণ হত্যা ও সততার সঙ্গে ব্যবসা ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক