রোজা ইসলামের তৃতীয় ফরজ বিধান। রোজা বলতেই আমরা শুধু রমজানের ফরজ রোজা বুঝি। অথচ ফরজ রোজা ছাড়াও অনেক প্রকার রোজা রয়েছে। রমজান মাসের রোজা ছাড়াও আরও অনেক রোজা রয়েছে। সেগুলো হলো―রোজা রাখা বা না রাখার দিক দিয়ে মোট ছয় প্রকার―
১. ফরজ রোজা―ফরজ রোজা আবার চার প্রকার। যথা―ক. রমজান মাসের রোজা। খ. কোনো কারণবশত রমজানের রোজা ভেঙে গেলে তার কাজা রোজা। গ. শরিয়তে স্বীকৃত কারণ ছাড়া রমজানের রোজা ছেড়ে দিলে কাফ্ফারা হিসেবে ৬০টি রোজা রাখা। এবং ঘ. রোজার মান্নত করলে তা আদায় করা ফরজ। মান্নতের রোজা দুই প্রকার। ১. কেউ কোনো কিছুর প্রত্যাশা করে যদি সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ উল্লেখ করে রোজার নিয়ত করে, তা হলে সে রোজা আদায় করা ফরজ। ২. অনির্দিষ্ট দিন-তারিখ উল্লেখ করে রোজার নিয়ত করে। দুটিই পরবর্তী সময়ে রাখা ফরজ। কেউ কেউ এগুলোকে ওয়াজিবও বলেছেন।
২. ওয়াজিব রোজা―নফল রোজা রেখে ভঙ্গ করলে পরবর্তী সময়ে তা আদায় করা ওয়াজিব। (আলমুহাল্লা : ৪/২৯৩)
৩. সুন্নত রোজা―মহররম মাসের নয় এবং দশ তারিখে রোজা রাখা। কেউ কেউ বলেছেন, সওমে দাউদ অর্থাৎ দাউদ (আ.) যে পদ্ধতিতে রোজা রাখতেন এসব পদ্ধতিতে রোজা রাখা সুন্নত। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন রোজা রাখতেন না। এভাবে রোজা রাখা সুন্নত। (বুখারি, ১৮৭৮)
৪. মুস্তাহাব রোজা―প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখে রোজা রাখা। (ইবনে খুযাইমা ২১২৭)। প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবারে রোজা রাখা। (আবু দাউদ ২৪৩৬)। কোনো কোনো ইমামের মতে, শাওয়াল মাসে পৃথক পৃথক প্রতি সপ্তাহে দুটো করে ছয়টি রোজা রাখা মুস্তাহাব।
৫. নফল রোজা―মুস্তাহাব আর নফল খুব কাছাকাছি ইবাদত। সহজ অর্থে নফল হলো যা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত নয় এমন ইবাদত পুণ্যের নিয়তে করা। রোজার ক্ষেত্রেও তাই। (ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/১৯৬)
৬. হারাম রোজা―বছরের পাঁচ দিন রোজা রাখা হারাম। জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২, ও ১৩ এবং শাওয়াল মাসের ১ তারিখ। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের দিন, ঈদুল আজহার দিন ও আইয়ামে তাশরিকের তিন দিন। (আবু দাউদ, ২৪১৮)
পবিত্র রমজান মাসের রোজা ছাড়া আরও বেশ কিছু রোজা রয়েছে। সেগুলো হলো―
১. শাওয়ালের ছয় রোজা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে রোজা পালন করল, অতঃপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা আদায় করল- সে যেন সারা বছর রোজা পালন করল।’ (মুসলিম, ২৮১৫)
২. আরাফার দিন রোজা : রাসুল (সা.)-কে আরাফার দিনে, অর্থাৎ জিলহজ মাসের নবম তারিখে রোজা রাখা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আরাফা দিবসের রোজা সম্পর্কে আল্লাহর কাছে আশা করি, তা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের পাপের কাফফারা হবে।’ (মুসলিম, ১১৬২)
৩. মুহররমের রোজা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসের পর সর্বোত্তম রোজা হলো, আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ।’ (মুসলিম, ১১৬৩)
৪. আশুরার রোজা : আবু কাতাদা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-কে আশুরার রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, ‘তা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা।’ (মুসলিম, ১১৬২)
৫. শাবানের রোজা : আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে শাবান মাস ছাড়া অন্য মাসে অধিক পরিমাণে নফল সিয়াম পালন করতে দেখিনি।’ (বুখারি, ১৯৬৯)
৬. প্রতি মাসে তিন রোজা : আবু হুরায়রা (রা.) রাসুল (সা.) সম্পর্কে বলেন, আমার বন্ধু আমাকে তিনটি বিষয়ের উপদেশ দিয়েছেন, প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোজা রাখা, দ্বি-প্রহরের পূর্বে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা ও নিদ্রার পূর্বে বিতিরের নামাজ আদায় করা।’ (বুখারি, ১৯৮১)
৭. সপ্তাহে দুই দিন রোজা : সপ্তাহে দুই দিন অর্থাৎ সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা পালন সুন্নত। আবু কাতাদা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-কে সোমবারে সিয়াম পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন, এ দিনে আমার জন্ম হয়েছে এবং এ দিনে আমাকে নবুওয়াত দেওয়া হয়েছে বা আমার ওপর কোরআন নাজিল শুরু হয়েছে।’ (মুসনাদে আহদম, ২২৫৪৯)
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক