অসহায় মানুষের শিক্ষা, সেবা ও পুনর্বাসনের জন্য মাওলানা ইমরান হুসাইন হাবিবী গড়ে তুলেছেন পিপলস ইমপ্রুভমেন্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিসব)। সারা দেশে ৫০টি মক্তব রয়েছে। কয়েক হাজার মানুষকে স্বাবলম্বী করেছেন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কোরআন শেখাচ্ছেন ও কর্মসংস্থান করছেন। নানামুখী সেবামূলক কাজে ব্যস্ত পিসব।
একজন মাওলানা ইমরান: মাওলানা ইমরান হুসাইন হাবিবীর জন্ম ঢাকার মিরপুরে। বাবা আব্দুল কুদ্দুছ মুন্সি তাবলিগের স্থানীয় আমির ছিলেন। ইমরান কোরআনের হেফজ শুরু করেছেন মিরপুরে। দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) করেছেন ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসা থেকে। মাদরাসাতুদ দাওয়াহ মিরপুর থেকে উচ্চতর ইসলামি দাওয়াহ ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পড়েছেন। শিক্ষা, সেবা, স্বাবলম্বী ও পুনর্বাসনের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন পিপলস ইমপ্রুভমেন্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিসব)। পিসবের সাধারণ সম্পাদক ও প্রকল্প পরিচালক তিনি।
বুক তার সেবার হৃদয়: তখন ২০০৬ সাল, ইমরান মিরপুর শাহ আলী বাগে হেফজ পড়ছেন। দেখলেন, অনেক ছাত্রের বিছানা-বালিশ, ট্রাঙ্ক বা কিতাবাদি নেই। ভাইদের থেকে টাকা এনে তাদের এসব কিনে দিলেন এবং পূরণ করলেন অন্যান্য প্রয়োজনও। ২০১১ সালে সংগঠক মাওলানা রজিবুল হকের সঙ্গে মেডিকেল ক্যাম্পে প্রথমে জামালপুরের মেলান্দহে যান। পরের বছর এলাকার তরুণদের নিয়ে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করে ছুটে যান রংপুর ও মুন্সীগঞ্জে। ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনে হতাহতদের জন্য কাজ করেন। ২০১৫ সালে কয়েকজন মিলে হাফেজ্জী হুজুর সেবা সংস্থা করেন। কাজ করেছেন মীর ফাউন্ডেশনে। বাসমাহ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
পিসবের পথচলা: ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সানাবিল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ছয়টি মসজিদ, দুটি মাদরাসা, গভীর নলকূপ স্থাপন ও সাঁকো নির্মাণ করেন। এক মাস বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেন। তখন তাদের জন্য স্কুল করতে সরকারি নিবন্ধনের প্রয়োজন পড়ে। ২০১৯ সালে পিপলস ইমপ্রুভমেন্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ নামে নিবন্ধন নিয়ে কাজ শুরু করেন। কার্যনির্বাহী সদস্যরা তখন বেশ ভূমিকা রেখেছিল।
আলোকিত মক্তব: ২০১৬ সাল থেকে কুড়িগ্রামে ইমাম ও মাদরাসার শিক্ষকদের বিশুদ্ধভাবে কোরআন শেখানোর প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ইমরান। শিশুদের ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন আলোকিত মক্তব। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৫০টির বেশি মক্তব রয়েছে পিসবের। শিক্ষার্থী রয়েছে ৪ হাজারের বেশি। শিক্ষক আছেন ৫০ জন। রয়েছে নিজস্ব সিলেবাস, স্বতন্ত্র বই ও কারিকুলাম। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন দুই ঘণ্টা পড়ানো হয়। পড়তে টাকা লাগে না। প্রতি বছর ২ হাজার ছাত্র কোরআন শিখছে। ৫০টি মক্তবে সন্ধ্যার পর বয়স্কদের কোরআন শেখানো হয়। ইমরান বললেন, ‘এখানে এক বছর পড়লে সবাই কোরআন পড়তে সক্ষম হয়। নুরানি, প্রাইমারি এবং হেফজ বিভাগে গল্প আকারে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো পড়ানো হবে। এসব কাজের অনুপ্রেরণা আমি আব্দুল হাই পাহাড়পুরী (রহ.) থেকে পেয়েছি। হুজুরের স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।’
স্বাবলম্বী প্রজেক্ট: বরিশালের মাওলানা ইয়াকুব প্রতিবন্ধী, থাকেন মিরপুরে। ২০০৭ সালের সিডরে তার ঘর ভেঙে যায়। মানুষের ঘরের চার-পাঁচ হাত বারান্দায় শুয়ে-বসে কাটে ছয়জনের দিন-রাত। ছেলেরা কখনো থাকেন মসজিদে। ইয়াকুব ঢাকায় কোরআন পড়ান। মসজিদে থাকেন। ইয়াকুবের বরিশালের ভিটায় মাটি ভরাট করে দিলেন ইমরানরা। চার রুমের পাকা ঘরসহ টিউবওয়েল ও বাথরুম করে দিলেন। মাওলানা ইয়াকুব বললেন, ‘জীবনে কল্পনাও করিনি এমন ঘর হবে আমার। আমার স্ত্রী-সন্তানরা এত ভালো ঘরে ঘুমাবে।’
পিসবের রয়েছে ‘স্বাবলম্বী প্রজেক্ট’। এ পর্যন্ত ৩ হাজার পাঁচশর বেশি মানুষকে স্বাবলম্বী করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি পরিবারকে চার রুমের পাকা ঘর, ১০টি দোকান, ৬৫টি রিকশা ও ভ্যান, ১৫ জেলায় ১৫০টির বেশি গভীর নলকূপ, ৭০টি টয়লেট দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে ৩৪টি মাদরাসা-মসজিদ করেছেন। সেলাই মেশিন, নৌকা, গরু-ছাগল, কৃষিপণ্য ও মাছ ধরার জালও দেন।
জীবন ওদের ভালো হোক: ২০১৮ সালে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কোরআন শেখানো শুরু করে পিসব। মিরপুর ১২-এ ‘পিসব কুটিরশিল্প’ আছে তাদের জন্য। সেখানে বর্তমানে ২৫ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কাজ করেন। এখান থেকেই কাজ শিখেছেন তারা। আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত তাদের কোরআন শেখানো হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে পিসব। করোনাকালে নানামুখী সেবা, রানা প্লাজায় হতাহতদের সহায়তা, সিলেট ও ফেনীর বন্যায় সহায়তা দিয়েছেন। ২০২০ সালে ১৫ হাজার, ২০২১ সালে ২০ হাজার মোটা কম্বল বিতরণ করেছেন। ২০২২ সালে ২৫টি জেলায় ৬ হাজার মাদরাসাছাত্রকে বিছানাপত্র এবং ২০২৩ সালে ৬ হাজার কম্বল দিয়েছে।
স্বপ্ন: অবহেলিত শিশুদের জন্য নিরাপদ আবাসন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে কাজ করছে পিসব। ইমরান বললেন, ‘কিয়ামত পর্যন্ত পিসবের সেবামূলক কাজ জারি থাকুক। শিক্ষা নিয়ে সুদূরপ্রসারী কাজ করতে চাই। দেশের অবহেলিত অঞ্চলে স্কুল ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সমন্বিত মাদরাসা করতে চাই।’
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক