এই যুগে মানসিক ও শারীরিক রোগের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এর একটি প্রধান কারণ, সঠিক সময়ে এবং শান্তিপূর্ণ ঘুমের অভাব—যা ধীরে ধীরে শরীরে বিভিন্ন জটিল রোগের জন্ম দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রচুর কাজ করতেন এবং ঘুমাতেন খুব অল্প সময়। তবুও তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয়, কর্মঠ এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। পৃথিবীর সব মানুষই শান্তির ঘুম চান। কীভাবে শান্তির ঘুম হতে পারে আমাদের, এখানে সে আলোচনা করা হলো—
ঘুমের সঠিক সময়
শান্তিপূর্ণ ঘুমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সঠিক সময়ে ঘুম। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের শরীরে একটি ‘জৈবিক ঘড়ি’ রয়েছে—যা দিনের আলো ও রাতের অন্ধকারের ভিত্তিতে আমাদের শরীরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এটি আমাদের শরীরকে সঠিক সময়ে ঘুমাতে, জাগতে এবং কাজের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। যখন আমরা নতুন অঞ্চল বা দেশে যাই, তখন এই জৈবিক ঘড়ি আমাদের শরীরকে স্থানীয় সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যা ‘HNF4A প্রোটিন’ তৈরি করে। এই প্রোটিন রাতে কম সক্রিয় থাকে এবং দিনে বেশি। যেমন, সকালের নাশতার পর আমরা কর্মচঞ্চল হই এবং রাতের খাবারের পর ক্লান্তি অনুভব করি—এটি এই জৈবিক ঘড়ির ফল।
তবে যদি এই প্রোটিনে কোনো বিঘ্ন ঘটে, তাহলে জৈবিক ঘড়ির কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়—যা আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমানো, রাতভর জেগে থাকা, কিংবা এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে দ্রুত ভ্রমণের কারণে এই ঘড়ির কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। এর ফলে মানুষের মানসিকতা, চিন্তাধারা, আচরণ এবং মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ করো, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল দীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৩০)
রাতের ঘুম এবং স্বাস্থ্যের প্রভাব
রাতে দীর্ঘ সময় কাজ করা ব্যক্তিদের প্রায়শই মানসিক ও শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ, রাতের বেলায় শরীরের জৈবিক ঘড়ি ঘুমের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করে এবং তখন কর্মক্ষমতা কমে যায়। যারা রাতে ডিউটি করেন, তারা দিনের বেলা ঘুমানোর চেষ্টা করলেও বাইরের আলো শরীরকে জাগ্রত রাখার সংকেত দেয়। ফলে তাদের ঘুম ঠিকমতো হয় না।
গবেষণা বলছে, রাতের শিফটে কাজ করা ৯৭ শতাংশ কর্মী কয়েক বছর কাজ করার পরও তাদের কাজের রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হন। এর ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিভিন্ন দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পেলে কর্মক্ষমতা ও শক্তি ফিরে আসে—যা আমাদের চঞ্চল ও সক্রিয় করে তোলে। কিন্তু যখন রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়ে আসে, তখন শরীরে অলসতা, ক্লান্তি এবং ঘুমের ভাব সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে আমরা ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে আমাদের জৈবিক ঘড়ি শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য রাত সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাতে বিশ্রাম গ্রহণ করতে পার। আর দিনকে তোমাদের দেখার উপযোগী করে বানিয়েছেন। নিশ্চয়ই এতে সেই সব লোকের জন্য বহু নিদর্শন আছে, যারা লক্ষ্য করে শোনে।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৬৭)
পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই রাতকে তোমাদের জন্য করেছেন পোশাক-স্বরূপ এবং ঘুমকে শান্তিময়। আর দিনকে ফের উঠে দাঁড়ানোর মাধ্যম বানিয়েছেন।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৭)
আলোর সঙ্গে জৈবিক ঘড়ির সম্পর্ক
জৈবিক ঘড়ি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া—যা দিন ও রাতের আলো-অন্ধকারের ভিত্তিতে কাজ করে। যখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসে, এই ঘড়ি শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে। রাতে যথাসময়ে ঘুমানো এবং সকালে যথাসময়ে জেগে ওঠা এই জৈবিক ঘড়ি ঠিক রাখার মূল হাতিয়ার। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনিই স্বীয় রহমতে তোমাদের জন্যে রাত ও দিন করেছেন, যাতে তোমরা তাতে বিশ্রাম গ্রহণ কর ও তার অনুগ্রহ অন্বেষণ কর এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা
আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এশার নামাজের আগে ঘুমানো এবং নামাজের পরে (অপ্রয়োজনীয়) কথাবার্তা বলা অপছন্দ করতেন।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৬৮)। নবিজি (সা.)-এর এই সুন্নাহ আমাদের শিক্ষা দেয়, এশার নামাজের পর অনর্থক জাগ্রত থাকার পরিবর্তে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া উচিত। এশার নামাজ দিনের শেষ ইবাদত, আর এ সময় দিনের কাজ-কর্ম শেষ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেওয়া শ্রেয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, উচ্চতর ইসলামি আইন গবেষণা বিভাগ, আল-জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া চট্টগ্রাম