ইসলামে মায়ের মর্যাদা এক বিশেষ আসনে অধিষ্ঠিত। ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত’—এই অমর উক্তিটি শুধু একটি বাক্য নয়, বরং এটি মাতৃত্বের মহিমা ও সন্তানের প্রতি মায়ের অসীম ত্যাগ এবং ভালোবাসার এক গভীরতম উপলব্ধি। একজন মায়ের ভূমিকা, তার কষ্ট, তার ত্যাগ এবং সন্তানের জীবনে তার প্রভাব এতই বিশাল যে, এর প্রতিদানস্বরূপ জান্নাতের মতো অমূল্য সম্পদও যেন নিতান্তই সামান্য।
মায়ের গর্ভে জীবনের অঙ্কুর: মায়ের গর্ভেই সন্তানের জীবনের প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। দীর্ঘ ন’মাস ধরে মা নিজের শরীরের প্রতিটি কণা দিয়ে সন্তানকে তিলে তিলে বড় করে তোলেন। এ সময় তিনি যে শারীরিক ও মানসিক কষ্টের সম্মুখীন হন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নিজের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে সন্তানের সুস্থ জীবন কামনাই থাকে তার প্রধান ধ্যান।
কোরআনের আলোয় মায়ের মর্যাদা: পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা মায়ের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বহুবার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা লুকমানে বলা হয়েছে, ‘আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদাচরণ করতে আদেশ করেছি। তার মা তাকে কষ্টসহকারে গর্ভে ধারণ করেছিল এবং দুই বছর তাকে বুকের দুধ পান করিয়েছে।’ (লুকমান, ৩১-১৪)। এই আয়াতে মায়ের গর্ভধারণের কষ্ট এবং দুগ্ধদানের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সন্তানের প্রতি মায়ের অসীম ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
হাদিসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: রাসুলুল্লাহ (সা.) মায়ের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থানে রেখেছেন। ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত’—এই বিখ্যাত হাদিসটি মায়ের গুরুত্ব ও সম্মানের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। অন্য এক হাদিসে তিনি সাহাবীকে তিনবার মায়ের খেদমত করার কথা বলেছেন এবং চতুর্থবারে পিতার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমেই প্রতীয়মান হয় ইসলামে মায়ের স্থান কতখানি উঁচুতে।
মায়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ: মা সর্বদা সন্তানের কল্যাণের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। সন্তানের সামান্য অসুস্থতায় মায়ের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। সন্তানের মুখের হাসির জন্য মা সকল কষ্ট হাসিমুখে বরণ করে নেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার জন্য মা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। মায়ের এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রতিদান কোনো পার্থিব সম্পদ দিয়ে সম্ভব নয়।
মায়ের কষ্টের প্রতিদান: গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের প্রতিটি ধাপে মা যে অপরিসীম কষ্টের সম্মুখীন হন, ইসলামে তার বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে মায়ের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সন্তানের ওপর তার হককে অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ করেছেন। মায়ের এই কষ্টের প্রতি সম্মান জানানো এবং তার সেবা করা সন্তানের জন্য অবশ্যকর্তব্য।
মায়ের দোয়ার ঐশ্বর্য: মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য আল্লাহর এক বিশেষ রহমত। মায়ের মুখের একটি আন্তরিক দোয়া সন্তানের জীবন পাল্টে দিতে পারে। হাদিসে মায়ের দোয়াকে আল্লাহর কাছে দ্রুত কবুল হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাই সন্তানের উচিত সর্বদা মায়ের দোয়া ও ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করা।
মায়ের পায়ের নিচে জান্নাতের অন্তর্নিহিত অর্থ: ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত’—এই উক্তিটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো মায়ের প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন এবং তার সেবা করার মাধ্যমেই সন্তান জান্নাতের পথে অগ্রসর হতে পারে। মায়ের সন্তুষ্টি অর্জন আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম উপায়। মায়ের আদেশ পালন, তার প্রয়োজন মেটানো এবং তার সাথে সর্বদা ভালো ব্যবহার করাই একজন সন্তানের প্রধান দায়িত্ব।
মায়ের প্রতি সহানুভূতি, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ একজন মুসলমানের চারিত্রিক ভূষণ। মায়ের কষ্টকে অনুভব করে তার পাশে থাকা, তার প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা করা এবং তার মনে শান্তি এনে দেওয়াই ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত’—এই গভীর সত্যের বাস্তবায়ন।
আসুন, আমরা প্রত্যেকে আমাদের মায়ের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল হই এবং তাদের ভালোবাসার প্রতিদানস্বরূপ নিজেদের জীবনকে তাদের সেবায় উৎসর্গ করি। কারণ মায়ের মুখের এক টুকরো হাসিই সন্তানের জন্য জান্নাতের অমূল্য চাবি হতে পারে।
লেখক: আলেম ও সাংবদিক