আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আপনি তাদেরকে বর্ণনা করুন আদমের দুই পুত্রের অবস্থা। যখন তারা উভয়েই কিছু কোরবানি করেছিল, তখন তাদের একজনের কোরবানি গৃহীত ও অপরজনের কোরবানি অগৃহীত হয়েছিল। সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ কেবল ধর্মভীরুদের কোরবানিই গ্রহণ করেন। (সুরা মায়েদা, ২৭)।
এ আয়াত থেকে বোধগম্য হয়, কোনো এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হজরত আদম (আ.) নিজ সন্তান হাবিল-কাবিলকে কোরবানি করতে আদেশ করেছিলেন। ইমাম কুরতুবি (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেন, যখন আদম এবং হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন, তখন তাদের মাধ্যমে সন্তানপ্রজনন ও বংশবিস্তারের ধারা আরম্ভ হয়। প্রজনন-পদ্ধতি ছিল, হজরত হাওয়া (আ.)-এর প্রতিটি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন একমাত্র আদম আ.-এর সন্তান ব্যতীত আর কোনো মানবসন্তান পৃথিবীতে ছিল না। তাই আল্লাহ তায়ালা বিয়ে-শাদীর ব্যবস্থাপনার সূচনা করতে আদম আ.-এর শরিয়তে বিশেষভাবে করবে, তারা পরস্পরে সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। তবে পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া পুত্র প্রথম গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া কন্যার সহোদর হিসেবে গণ্য হবে না।
তারা পরস্পরে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। কিন্তু ঘটনাচক্রে কাবিলের সহজাত সহোদর বোন ‘আকলিমা' ছিল পরমা সুন্দরী, আর হাবিলের সহজাত বোন 'লিজ' ছিল অতিশয় কুৎসিত। বিবাহের সময় এলে তাদের শরিয়ত-অনুসারে হাবিলের সহোদরা কুৎসিত বোন কাবিলের পাত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয় । আর হাবিলের ভাগ্যে জুটে কাবিলের সুন্দরী বোন আকলিমা। কিন্তু কাবিল তা সন্তুষ্টচিত্তে না মেনে হাবিলের সাথে শত্রুতা শুরু করে। সে দাবি করে, আমার সহোদরা বোনকেই আমার সাথে বিয়ে দিতে হবে। আদম (আ.) তার এ দাবিকে প্রত্যাখান করেন। কিন্তু কাবিল তার দাবিতে রইল অনড় । তখন আদম আ. হাবিল-কাবিলের মতভেদ দূর করার লক্ষ্যে বললেন, তোমরা উভয়ে আল্লাহর নিকট নিজ নিজ কোরবানি পেশ করো। যার কোরবানি কবুল হবে সেই ‘আকলিমা'-কে বিয়ে করবে। এ নির্দেশ মেনে তারা উভয়ে কোরবানি করল। হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি প্রতিপালন করত, তা থেকে একটি দুম্বা উৎসর্গ করার জন্য ইচ্ছেপোষণ করল। কাবিল কৃষি কাজ করত।
এ হিসেবে সে কিছু শষ্য ও গম কোরবানির জন্য নির্ধারণ করল। সে সময়ে কোরবানি কবুল হওয়ার নিদর্শন হিসেবে আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কোরবানির বস্তু জ্বালিয়ে দিতো। অর্থাৎ যার কোরবানিসামগ্রী জ্বলে যেত, তার কোরবানি কবুল হয়েছে বলে স্বীকৃতি পেত। এ নিয়মানুসারে আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবিলের কোরবানিটিকেই জ্বালিয়ে দিলো। আর কাবিলের কোরবানি যথাস্থানে পড়ে রইল। মোটকথা, এ আয়াতের সূত্র থেকে পরিলক্ষিত হয়, সর্বপ্রথম হজরত আদম (আ.) এর সন্তান হাবিল-কাবিলই কোরবানি করেছিল। (তাফসিরে কুরতুবি, ৬/১৩৪)
এখন প্রশ্ন হতে পারে, মুসলমানদের প্রচলিত কোরবানি আদম (আ.)-এর সুন্নাত নাকি ইবরাহিম (আ.)-এর? ইসলামধর্মে প্রচলিত কোরবানি ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নাত। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোরবানি তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত। (মিশকাত, ১/১২৯)
লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক