মহান আল্লাহ বান্দার জানমালের ওপর আঘাত দিয়ে পরীক্ষা করেন। বান্দার মর্যাদা বুলন্দ করার জন্যই আল্লাহপাক এরূপ পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেন। এক্ষেত্রে বান্দা যখন বিপদ-মুসিবতে পড়ে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তখন তার মর্যাদা বুলন্দ হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা নেব কিছু অভাব-অনটন দিয়ে, কিছু জানমালের ক্ষতি দিয়ে, কিছু ফল-ফসলের ক্ষতি দিয়ে। হে নবি, তুমি ধৈর্য ধারণকারীদের সুসংবাদ জানিয়ে দাও। (সুরা বাকারা, ১৫৫)।
মহান আল্লাহ যাকে অধিক প্রিয় মনে করেন তাকে বড় বড় পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেন। এ জাতীয় পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আল্লাহপাক যাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান তাকে জানমালের ওপর আঘাত দিয়ে পরীক্ষা করেন। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদেরকেই এ রকম পরীক্ষার সম্মুখীন বেশি করা হয়। আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা হলেন নবিরা।
রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানুষের মধ্যে কাদের পরীক্ষা সবচেয়ে বেশি কঠিন নেওয়া হয়। রাসুল (সা.) জবাবে বলেছিলেন, সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা নেওয়া হয় নবিদের, তার পর আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের। (তিরমিজি)
হজরত আদম ইব্রাহিম (আ.)-কে আগুনে ফেলে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। হজরত ইউনুস (আ.)-কে মাছের পেটে নিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। হজরত যাকারিয়া (আ.)-কে কাফেররা করাত দিয়ে চিরে দুই খণ্ড করে পরীক্ষা নিয়েছিল।
হজরত আইয়ুব (আ.)-কে কঠিন রোগে আক্রান্ত করে পরীক্ষা নিয়েছিল। ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানির আদেশ দিয়ে পরীক্ষা নিয়েছিলেন। এভাবে মহান আল্লাহ তার প্রিয় নবিদের কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের মর্যাদা বুলন্দ করেন। মুসলমানদের জন্য আল্লাহপাক জান্নাত তৈরি করেছেন। সেই জান্নাতের জন্য যা কিছু মেহনত-মোজাহেদা করা দরকার, সেই মেহনত ও মোজাহেদার মধ্যে ভুল-ত্রুটি থেকে যায়। আল্লাহপাক সেই ভুল-ত্রুটি সংশোধন করার জন্য দুনিয়াতে বালা-মসিবত দিয়ে কষ্ট দিয়ে থাকেন। কিছু বিপদ-আপদ ও কষ্ট-ক্লেশ দিয়ে পরীক্ষা করেন গুনাহ মোচনের জন্য। এ জন্য বিপদ-আপদ, কষ্ট-ক্লেশ মুসলমানদের জন্য রহমতস্বরূপ। কারণ এটা মুমিনের পাপমোচনের মোক্ষম সুযোগ।
রাসুল (সা.) বলেন, মুমিনের ব্যাপারটা বড় অদ্ভুত। মুমিন ব্যতীত আর কারও ক্ষেত্রে এমনটা নয়। যদি তার সুখের কিছু হয়, তা হলে সে শোকর আদায় করে, সেটাও তার জন্য কল্যাণকর। আবার যদি কষ্টের কিছু হয় তা হলে সে সবর করে, সেটাও তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। (মুসলিম)
বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবতে আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া যাবে না। আল্লাহর সাহায্যের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। বেশি বেশি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। অনেক সময় এমন হয় যে, উপর্যুপরি বালা-মুসিবতে আক্রান্ত থাকার কারণে মনের মধ্যে হতাশা এসে যায় যে আমার বিপদ বোধহয় আর কাটবে না। এভাবে জীবনের প্রতিও হতাশা কিংবা বিতৃষ্ণা এসে পড়ে।
এ রকম অবস্থা হলে পবিত্র কোরআনের বাণীটি স্মরণ করুন। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত হতে কাফের সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না। (সুরা ইউসুফ, ৮৭) আরও ইরশাদ হয়েছে, হতাশ হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। (সুরা তাওবা, ৪০)। আল্লাহতায়ালা আরও ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর রহমত সৎ কর্মশীলদের নিকটবর্তী। (সুরা আরাফ, ৫৬)
মুসলমানের জন্য তাকদিরের প্রতিটি ফায়সালাই কল্যাণকর। প্রত্যেক বান্দাকে আল্লাহর ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, সবকিছুই তাকদিরের ফায়সালা অনুযায়ী হয়, তাকদিরে যা কিছু লেখা আছে, তা ঘটবেই। তাকদিরের ফায়সালায় নিজেকে সন্তুষ্ট করুন। দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ কোনো বান্দার অমঙ্গল চান না। যে অবস্থার মধ্য যার মঙ্গল সে অবস্থায় আল্লাহ তাকে রেখেছেন। আপনার চেয়ে যে বেশি বিপদগ্রস্ত তার কথা স্মরণ করুন- আপনার কষ্টবোধ হ্রাস পাবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক