আমাদের সমাজে মোহরানা এবং মিরাসসংক্রান্ত বিষয়ে নানা রকম ভুল বোঝাবুঝি দেখা যায়। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী যদি তার প্রাপ্য মোহরানা মাফ করে দেন, তা হলে কি তা গ্রহণযোগ্য হবে? অনেকেই মনে করেন, মৃত ব্যক্তির কাছে পাওনা মাফ করা যায় না, অথবা এতে কিছু শর্ত থাকে। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের বিধানে এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট।
মোহরানা মাফ হওয়ার শর্ত
ইসলামি শরিয়তে কারও প্রাপ্য অধিকার মাফ হওয়ার জন্য একটি মৌলিক শর্ত রয়েছে-
পাওনাদারকে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি ছাড়া সন্তুষ্টচিত্তে তা মাফ করতে হবে। এক্ষেত্রে দেনাদার (অর্থাৎ স্বামী) বেঁচে থাকা আবশ্যক নয়। সুতরাং স্বামীর মৃত্যুর পর যদি স্ত্রী সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, বিনা জোরজবরদস্তি বা কোনো প্রকার প্রভাব ছাড়াই নিজের প্রাপ্য মোহরানার অধিকার মাফ করে দেন, তবে সেই মাফ শরিয়তসম্মতভাবে কার্যকর হবে। এ অবস্থায় স্ত্রী পরে তার স্বামীর ত্যাজ্যসম্পদ থেকে সেই মোহরানার অর্থ আদায় করতে পারবেন না।
পূর্বের ভুল ধারণার সঙ্গে পার্থক্য
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার। পূর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম যে, স্ত্রীর মৃত্যু-মুহূর্তে বা মুমূর্ষু অবস্থায় মোহরানা মাফ করা হলে তা কার্যকর হয় না। এর কারণ হলো, সেই অবস্থায় ব্যক্তি সাধারণত সুস্থ মস্তিষ্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না এবং প্রায়শই আবেগ বা পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে প্রভাবিত হন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী যখন সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় থাকেন এবং স্বেচ্ছায় মোহরানা মাফ করেন, তখন সেই মাফ কার্যকর হয়। এই বিধানটি কিতাবুল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৯৩; কুতুবখানা নাইমিয়া, দেওবন্দ কর্তৃক প্রকাশিত এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ফিকহ গ্রন্থ দ্বারা সমর্থিত। (যেমন- শরহুশ নাজমা, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা: ২৭; রদ্দুল মুহতার ইবনু আবিদিন, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১১০; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া, ৩২.৩২০)।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
এই মাসআলার মূল বার্তা হলো, একটি অধিকার মাফ করার ক্ষেত্রে পাওনাদারের আন্তরিক সদিচ্ছা এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি স্ত্রী সুস্থ মস্তিষ্কে ও সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এই সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি মোহরানা মাফ করে দিচ্ছেন, তবে ইসলামি শরিয়তে তা গ্রহণযোগ্য। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন স্বামীর পরিবার অনাকাঙ্ক্ষিত দেনার চাপ থেকে মুক্ত হয়, তেমনি স্ত্রীর জন্যও এটি এক প্রকার সওয়াবের কারণ হতে পারে। সমাজে এই সঠিক বিধান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভুল ধারণাগুলো দূর হয় এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে সব সমস্যার সমাধান হয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক