প্রশ্ন: বিবাহও কি তাকদিরে লেখা আছে? যদি তাই হয়, তা হলে নেককার স্ত্রী চেয়ে দোয়া করার প্রয়োজন কি? দোয়া করলে কি তাকদির পরিবর্তন হয়?
উত্তর: আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেকের মনেই এ ধরনের প্রশ্ন থাকে। শরিয়তের আলোকে এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানব ।
১. বিবাহ ও তাকদির: এক সুনির্ধারিত বিষয় হ্যাঁ, বিবাহসহ মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাবতীয় বিষয় আল্লাহতায়ালার তাকদিরে পূর্ব থেকে লেখা রয়েছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, আর তোমাদেরকে (নর ও নারীর) যুগল রূপে সৃষ্টি করেছি। (সুরা নাবা, আয়াত ৮)। এ ছাড়াও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, একজন মানুষের মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থাতেই তার সবকিছু লিপিবদ্ধ করা হয়। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা রেহেমে (মাতৃগর্ভে) একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে দেন। তখন ফেরেশতা বলতে থাকেন, হে আমার প্রতিপালক! (এখন তো) বীর্য। হে আমার প্রতিপালক! (এখনো) জমাট রক্ত।
হে আমার প্রতিপালক! (এখনো) গোশতের টুকরো। এর পর যখন আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করার ফয়সালা করেন তখন ফেরেশতা বলেন, হে আমার রব! (সে কি) পুরুষ না স্ত্রীলোক, দুর্ভাগ্য না ভাগ্যবান হবে? তার জীবিকা (কি হবে)? তার আয়ু (কী হবে)? এর পর নির্দেশ মোতাবেক তার মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায়ই এ সবকিছু লিপিবদ্ধ করা হয়। (সহিহ মুসলিম, ৬৪৮৯)। আবু তুফায়ল (রা.) আবু সারীহা হুযাইফা ইবনে আসীদ গিফারি (রা.) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, শুক্র জরায়ুতে চল্লিশ রাত অবস্থান করার পর একজন ফেরেশতা তাকে আকৃতি দান করেন এবং তার জীবিকা, বয়স, চরিত্র এবং সে ভাগ্যবান না হতভাগা হবে– এ সবকিছু লিপিবদ্ধ করেন।
২. তাকদির লেখার প্রকারভেদ ও দোয়ার ভূমিকা
এখান থেকে প্রশ্ন আসতে পারে যে, তাকদির যদি পূর্বেই নির্ধারিত থাকে, তা হলে দোয়া করে কী লাভ? আসলে তাকদির লেখার দুটি প্রধান পর্যায় রয়েছে:
১. লাওহে মাহফুযের লিখন (অপরিবর্তনীয় তাকদির): হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রাযি.) বর্ণিত হাদিসে আছে, আল্লাহ মাখলুকাতের তাকদির লিখেছেন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে। (মুসলিম) এটি হলো ‘উম্মুল কিতাব’ বা লাওহে মাহফুযের লিখন, যা আল্লাহতায়লা নিজ ইলম ও কুদরতে যা কিছু সৃষ্টি করবেন বলে স্থির করেছেন, তা আদি কলম দ্বারা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এ লেখায় কোনো পরিবর্তন নেই। এটি হলো অপরিবর্তনীয় তাকদির।
২. মাতৃগর্ভে লিপিবদ্ধ লিখন (পরিবর্তনযোগ্য তাকদির): আমাদের আলোচ্য হাদিসে মাতৃগর্ভে ফেরেশতাদের দ্বারা যে তাকদির লেখানো হয়, তা স্বতন্ত্র একটি লিখন। এই লেখায় পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন হাদিসে যে বিভিন্ন আমলের দ্বারা আয়ু বাড়া-কমার উল্লেখ পাওয়া যায়, তার সম্পর্ক এই লেখার সঙ্গেই। পবিত্র কোরআনেও এর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে, আল্লাহ যা চান (অর্থাৎ যে বিধানকে ইচ্ছা করেন) রহিত করে দেন এবং যা চান বলবৎ রাখেন। সমস্ত কিতাবের যা মূল, তা তাঁরই কাছে। (সুরা রাদ,৩৯)
সুতরাং দোয়ার দ্বারা তাকদিরের এই পরিবর্তনযোগ্য অংশে প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ আমরা যখন নেককার স্ত্রী চেয়ে দোয়া করি, তখন আল্লাহতায়ালা সেই দোয়ার বরকতে আমাদের তাকদিরের এই পরিবর্তনযোগ্য অংশকে আমাদের অনুকূলে করে দেন। দোয়া তাকদিরকে পরিবর্তন করতে পারে– এ বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. মাতৃগর্ভে লিপিবদ্ধ চারটি বিষয় ও তার শিক্ষা
হাদিসে মাতৃগর্ভে যে চারটি বিষয় লেখা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো:
রিজিক: আমাদের প্রত্যেকের রিজিক নির্ধারিত আছে। তাই অহেতুক লোভ করা উচিত নয়। চেষ্টা অবশ্যই করব, তবে তাতে বাড়াবাড়ি করব না। যখন যা অর্জিত হয়, তাতে সন্তুষ্ট থাকব।
জীবনকাল: দুনিয়ায় কে কত দিন বাঁচবে তাও লেখা হয়। সুতরাং যার যখন মৃত্যু হয়, তা তার নির্দিষ্ট সময়ই হয়। আমাদের উচিত আল্লাহতায়ালার ফয়সালা হিসেবে তা মেনে নেওয়া।
পুরুষ/স্ত্রী: ব্যক্তির লিঙ্গ নির্ধারিত হয়।
ভাগ্যবান/হতভাগা: এর মানে আমলও লেখা হয়। যার আমল ভালো সে ভাগ্যবান, আর যার আমল মন্দ সে হতভাগা।
৪. তাকদিরের ওপর বিশ্বাস ও তার ফল
তাকদিরের ওপর বিশ্বাস রাখা ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ। এই বিশ্বাস ছাড়া কেউ মুমিন হতে পারে না। মৃত্যু তো বটেই, ছোটখাটো কোনো আঘাতও তাকদিরের লিখন ছাড়া হয় না। যেকোনো অর্জন বা যেকোনো ক্ষতি তাকদির অনুযায়ীই হয়ে থাকে। এতে বিশ্বাস রাখাতেই দুনিয়ার প্রশান্তি ও আখেরাতের মুক্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, কোনো বান্দা ঈমানের প্রকৃত স্তরে পৌঁছতে পারে না, যতক্ষণ না সে মনেপ্রাণে জেনে নেয় যে, যা সে লাভ করেছে তা তার হারানোর ছিল না, আর যা সে হারিয়েছে তা তার পাওয়ার ছিল না।
৫. তাকদিরের রহস্য
প্রকাশ থাকে যে, তাকদিরের বিষয়টি আল্লাহতায়ালার এক গুপ্ত রহস্য। এর প্রকৃত স্বরূপ আল্লাহতায়ালাই জানেন। এ নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করা উচিত নয়। ঘাঁটাঘাঁটি করলে এর কূলকিনারা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং তাতে অস্থিরতাই বাড়ে এবং পদস্খলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উলামায়ে কেরাম বলেন, আল্লাহতায়ালা নিজ হিকমতে তাকদিরের জ্ঞান মানুষের থেকে আড়াল করে রেখেছেন। কারও আকল-বুদ্ধি তা আয়ত্ত করতে সক্ষম নয়।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে যে, যখন তাকদিরের আলোচনা আসে, তখন তোমরা ক্ষান্ত হয়ে যেও। বলা হয়ে থাকে, জান্নাতবাসীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখনই তাদের কাছে তাকদিরের রহস্য উন্মোচিত হবে, তার আগে নয়।
অতএব, তাকদির নির্ধারিত থাকলেও, আল্লাহতায়ালা দোয়ার মাধ্যমে সেই তাকদিরের কিছু অংশ পরিবর্তন করার ক্ষমতা রেখেছেন, যা তাঁরই কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। আর এ কারণেই নেককার জীবনসঙ্গী চেয়ে দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ফলপ্রসূ।