ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যাতে মানুষের জীবনের প্রতিটি দিক অন্তর্ভুক্ত। তবে, রাষ্ট্র ও রাজনীতির সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে মুসলিমবিশ্বে দীর্ঘকাল ধরে মতপার্থক্য বিদ্যমান। এই মতপার্থক্য কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এর প্রায়োগিক দিকও আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর গঠন ও চরিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
আল্লাহ বলেছেন, ‘তুমি কি সেই লোকেদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ কিতাবের এবং তোমার আগে অবতীর্ণ কিতাবের ওপর ঈমান এনেছে বলে দাবি করে, কিন্তু তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, অথচ তাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে বহুদূরে নিয়ে যেতে চায়।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৬০)
এ আয়াতে উল্লিখিত ‘তাগুত’ শব্দটি ‘সীমা লঙ্ঘন’ বা ‘সীমা অতিক্রম করা’বিষয়ক মূল আরবি থেকে উদ্ভূত। কোরআনে তাগুতকে শয়তান, মূর্তি, প্রতিমা এবং মিথ্যা মতবাদের উপাস্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপ হলো, সেই ব্যক্তি বা ব্যবস্থা, যা আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করে অথবা আল্লাহর আইনের বিপরীতে নিজস্ব আইন দিয়ে বিচার-ফয়সালা করে বা জীবন পরিচালনায় বাধ্য করে।
তাফসিরের গ্রন্থগুলোতে এই আয়াতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, বিচার ও আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। যে ব্যক্তি বা ব্যবস্থা এই সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে নিজের মনগড়া আইন দ্বারা ফয়সালা করে, সে তাগুতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ইসলামি বিধানমতে, তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করা এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অপরিহার্য শর্ত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানব-রচিত আইনকে (যা আল্লাহর আইন ও বিধানের বিপরীত) সার্বভৌম হিসেবে গ্রহণকারী রাষ্ট্র বা শাসনব্যবস্থা তাগুতের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে। তাই রাষ্ট্র ও ইসলামকে আলাদা করার অর্থ হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে তাগুতের সার্বভৌমত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপন করা, কারও কারও মতে যা ঈমান ভঙ্গকারী একটি কাজ হিসেবে বিবেচিত।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা কাফির।’ (সুরা আল-মায়েদা, আয়াত, ৪৪)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা জালেম।’ (সুরা আল-মায়েদা, আয়াত, ৪৫)। তিনি আরও বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা ফাসিক।’ (সুরা আল-মায়েদা, আয়াত, ৪৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল একজন ধর্মপ্রচারকই ছিলেন না, বরং তিনি একই সঙ্গে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক, সেনাপতি, বিচারপতি ও কূটনীতিক হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছেন। মক্কায় দাওয়াত প্রদানকালে তিনি একটি নিপীড়িত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন, কিন্তু মদিনায় হিজরতের পর তিনি একটি ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। তিনি বিচারপতি ও শাসক নিয়োগ করেছেন, বিভিন্ন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন এবং একটি উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার এসব কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, ইসলাম ও রাষ্ট্র একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
রাসুল (সা.)-এর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে মদিনা সনদকে উল্লেখ করা হয়। এই সনদকে বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। এ সংবিধানে যেভাবে মুসলিম, ইহুদি ও পৌত্তলিক সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
ইসলামের ফিকহশাস্ত্রে (আইনশাস্ত্র) রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও শাসনব্যবস্থাকে একটি অপরিহার্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে, বিভিন্ন বিধান, আদর্শ ও দিকনির্দেশনা উপস্থাপন করা হয়েছে। মুসলিম স্কলারগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, সমাজে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখা মুসলিমদের জন্য একটি সম্মিলিত দায়িত্ব বা ফরজ বিধান।
আবু আল-হাসান আলী আল-মাওয়ার্দী (রহ.) তার রচিত আল-আহকাম আল-সুলতানিয়া (প্রশাসনিক বিধিমালা) নামক গ্রন্থে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও খিলাফতের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা দিয়েছেন। তার মতে, ইমামত বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব হলো নবুয়তের প্রতিনিধিত্ব এবং এর প্রধান কর্তব্য হলো দেশে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করা।
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তার গ্রন্থ আস-সিয়াসাত আশ-শারিয়াহতে শাসকের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, শাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন ও জনগণের কল্যাণ সাধন করা। ইসলাম ও রাষ্ট্র একে অপরের ওপর নির্ভরশীল; যখন তারা আলাদা হয়, তখন উভয়ই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়।
আধুনিক যুগে ইসলাম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে একাধিক মডেল ও দর্শন বিকশিত হয়েছে। ইসলামকে রাষ্ট্র থেকে পৃথকীকরণের ধারণাটি ধর্মতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য। কোরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহশাস্ত্রের একটি বড় অংশই রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে। রাসুল (সা.)-এর জীবন এই ধারণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। কারণ তিনি ছিলেন সফল একজন রাষ্ট্রনায়ক।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক