অর্থনৈতিক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও স্বাভাবিকতা বজায় রাখা ইসলামি শরিয়তের একটি মৌলিক নীতি। মজুতদারির মতো আরেকটি অর্থনৈতিক অপকর্ম রয়েছে, যা কৃত্রিমভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে— তা হলো মধ্যস্বত্বভোগ বা দালালি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই প্রথাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতা নিশ্চিত করা।
শহরে দালালির প্রচলিত চিত্র
সাধারণত এই নিষেধাজ্ঞাটি শহরে ব্যক্তি যেন গ্রাম্য লোকের পণ্য নিয়ে অধিক মূল্যে বিক্রি করে না দেয়— এই বাক্যে বর্ণিত হয়েছে। এই লেনদেনের চিত্রটি ছিল অত্যন্ত সরল, কিন্তু এর প্রভাব ছিল মারাত্মক। যেমন- একজন গ্রাম্য কৃষক বা বিক্রেতা তার পণ্য (যেমন শস্য বা ফল) নিয়ে শহরের বাজারে আসে, উদ্দেশ্য বাজারের স্বাভাবিক দামে তা বিক্রি করা। কিন্তু পথিমধ্যে শহরের এক মধ্যস্বত্বভোগী (দালাল) তার সঙ্গে দেখা করে এবং প্রস্তাব দেয়: তোমার পণ্য আমার কাছে দাও, আমি কিছুক্ষণ পর আরও বেশি দামে এগুলো বেচে দেব।
যদি গ্রাম্য লোকটি নিজে বিক্রি করত, তবে পণ্যটি বাজারে তার স্বাভাবিক দামে বিক্রি হতো এবং শহরবাসীরা সাশ্রয়ী দামে তা কিনতে পারত। কিন্তু দালাল প্রবেশ করার কারণে, গ্রাম্য বিক্রেতা স্বল্পশ্রমে বেশি দাম পাচ্ছে ঠিকই, তবে পণ্যটির চূড়ান্ত মূল্য কৃত্রিমভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে সামষ্টিক কল্যাণ বড়
নবিজি (সা.) এই দালালিকে এতটাই অপছন্দ করেছেন যে, তা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বেও স্থান পায়নি। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, শহুরে ব্যক্তি যেন গ্রাম্য লোকের পক্ষ হয়ে (অধিক লাভে তার পণ্য) বিক্রি না করে; যদিও সে (গ্রাম্য ব্যক্তি) তার ভাই বা পিতা হোক। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এই হাদিস দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে যে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও মুনাফার চেয়ে সমাজের সামষ্টিক কল্যাণ এবং জনগণের সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য প্রাপ্তির অধিকার ইসলামের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আত্মীয় বা বন্ধুর পক্ষে দালালি করে বাজার অস্থিতিশীল করা শরিয়তে বৈধ নয়।
প্রাকৃতিক জোগান-চাহিদার ওপর ছেড়ে দাও
দালালির নিষেধাজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসার ময়দানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, শহরে কোনো ব্যক্তি যেন গ্রাম্য লোকের পক্ষ হয়ে পণ্য বিক্রি না করে। তোমরা লোকদেরকে (আপন অবস্থায়) ছেড়ে দাও; মহান আল্লাহ তাদের এক দলকে অপর দলের মাধ্যমে রিজিক দান করবেন। (সহিহ মুসলিম)
নবিজি (সা.)-এর এই কালজয়ী উক্তিটিই ইসলামি অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করেছে। এর অর্থ হলো:
১. কৃত্রিম হস্তক্ষেপের নিষেধাজ্ঞা: বাজার, দ্রব্যমূল্য এবং পণ্যের আদান-প্রদানকে স্বাভাবিক চক্র ও প্রাকৃতিক জোগান-চাহিদার ওপর ছেড়ে দিতে হবে। সেখানে কোনো ধরনের কৃত্রিম হস্তক্ষেপ, নিয়ন্ত্রণ বা দালালি থাকতে পারবে না।
২. রিজিকের নিশ্চয়তা: দালালকে না পেলেও গ্রাম্য বিক্রেতা তার প্রাপ্য রিজিক বাজারে পেয়ে যাবেন। আর ক্রেতারাও ন্যায্য দামে পণ্যটি পাবে। আল্লাহ একদলকে আরেক দলের মাধ্যমে রিজিক দেবেন— এটিই বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম।
তাউস (র.) যখন ইবনু আব্বাস (রা.)-কে এই হাদিসের অর্থ জিজ্ঞেস করলেন, তখন ইবনু আব্বাস (রা.) সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্ট জবাব দেন, সে যেন তার পক্ষে দালাল না হয়।
নাসিহাহ (সদুপদেশ) এবং দালালির পার্থক্য
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা জরুরি। শহুরে দালালির মাধ্যমে উচ্চ মুনাফা অর্জন করা নিষিদ্ধ। কিন্তু শহুরে কোনো ব্যক্তি যদি দালালদের মতো পারিশ্রমিক গ্রহণ করা ব্যতিরেকেই গ্রাম্য বিক্রেতাকে বাজারের সঠিক হালচাল বা ন্যায্য মূল্য জানিয়ে দেয়— তবে তা বৈধ, বরং প্রশংসনীয়।
কারণ, এটি হচ্ছে নাসিহাহ বা সদুপদেশ ও কল্যাণ কামনা, যা দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নবিজি (সা.) বলেছেন, দ্বীন হলো সদুপদেশ ও কল্যাণ কামনা। (সহিহ মুসলিম: ৫৫)
তাই দালালির মাধ্যমে অবৈধভাবে মূল্যবৃদ্ধি করা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো ব্যবসায়ীকে সঠিক মূল্য জানিয়ে সহযোগিতা করা এবং তাকে ঠকে যাওয়া থেকে বাঁচানো— ইসলামে তেমনই বরকতপূর্ণ কাজ। ইসলামি অর্থনীতিতে, সদুপদেশ দিয়ে সহায়তা করা বৈধ, কিন্তু মুনাফার লোভে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা বা মধ্যস্বত্বভোগের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ঘটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক