দাম্পত্য জীবন মানবজীবনের এক পবিত্র বন্ধন, যা পারস্পরিক ভালোবাসা, আস্থা ও সমঝোতার ভিত্তিতে টিকে থাকে। ইসলাম এই বন্ধনকে সুদৃঢ় ও টেকসই করার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তবে কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন শতচেষ্টা ও আপসের পরেও স্বামী-স্ত্রীর পক্ষে এক সঙ্গে থাকা আর সম্ভব হয় না। চরম বিতৃষ্ণা, অধিকার আদায়ে অপারগতা এবং তিক্ততা যখন দাম্পত্য জীবনের সব সৌন্দর্য গ্রাস করে নেয়, তখন বাধ্য হয়েই জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্তটি নিতে হয়।
তালাক অপছন্দনীয় হালাল: ইসলামে তালাক বা বিবাহ-বিচ্ছেদকে কখনো উৎসাহ দেওয়া হয়নি বা একে উত্তমও বলা হয়নি। বরং এটিকে অপছন্দনীয় একটি পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা কেবল চরম প্রয়োজনের মুহূর্তে বৈধতা লাভ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা: তালাকের অপছন্দনীয়তার বিষয়টি নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস দ্বারা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল বস্তু হলো তালাক।
অন্য একটি বর্ণনায় এর চেয়েও কঠোরভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহতায়ালা তালাকের চেয়ে অধিক অপছন্দনীয় কিছু হালাল করেননি।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বক্তব্যটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। তালাক হালাল বা বৈধ হলেও এটি আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয়। এই অপছন্দনীয়তা প্রমাণ করে যে, এটি কোনো স্বাভাবিক বা সহজলভ্য বিষয় নয়; বরং বিশেষ ও গুরুতর প্রয়োজনে প্রয়োগের জন্য বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।
তালাকের বৈধতার ক্ষেত্র: শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য যখন সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, যেমন-
১. উপদেশ: প্রথমে স্বামী-স্ত্রীকে সদুপদেশ দেওয়া। ২. বিছানা পৃথকীকরণ: এর পরও সমস্যার সমাধান না হলে সাময়িকভাবে বিছানা পৃথক করে দেওয়া। ৩. সালিশ-মধ্যস্থতা: সবশেষে পরিবার ও সমাজের বিজ্ঞজনদের মাধ্যমে সালিশ বা আপসের (হাকাম নির্ধারণের) সব প্রচেষ্টা চালানো।
এসব প্রচেষ্টা যখন চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে, বিতৃষ্ণা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং দাম্পত্য জীবনের হক আদায় করে সহাবস্থান তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে— তখনই ইসলাম বাস্তবতা ও প্রয়োজনের দিকে তাকিয়ে স্বামীর জন্য সর্বশেষ সমাধান হিসেবে তালাকের বৈধতা দিয়েছে।
প্রয়োজনের চূড়ান্ত সমাধান: প্রবাদ আছে, ‘যখন মতৈক্য অসম্ভব, বিচ্ছেদই তখন একমাত্র পথ।’ এই প্রবাদটি ইসলামি শরিয়তের তালাকসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিধ্বনি। তালাক হলো এমন একটি ‘হালাল’ মাধ্যম, যা তিক্ততা ও অশান্তির দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রণা থেকে স্বামী-স্ত্রী উভয়কে মুক্তি দেয়। এটি দাম্পত্য বন্ধনের ইতি টেনে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ করে দেয়, যখন পুরোনো বন্ধন আর কোনোভাবেই ধরে রাখা সম্ভব হয় না।
তালাক ইসলামের দেওয়া এমন এক বৈধতা, যা চরম অপছন্দনীয় হওয়া সত্ত্বেও মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেয়। এটি আবেগের বশে বা তুচ্ছ কারণে প্রয়োগের বিষয় নয়; বরং সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ন্যায়সঙ্গত বিচ্ছেদ ছাড়া যখন যাবতীয় দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কেবল তখনই স্বামীর জন্য এটি আল্লাহর শরিয়ত প্রদত্ত সর্বশেষ ও বাধ্যগত মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত। দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা রক্ষায় ব্যর্থ হলে, এই বিচ্ছেদই কখনো কখনো উভয় পক্ষের জন্য শান্তি ও মুক্তি নিয়ে আসে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক